রাজশাহী নগরীতে পূর্ব কোনো ঘোষণা ছাড়া হঠাৎই রবিবার (২৮ আগস্ট) ভোর থেকে পাঁচ সিটের চার্জার অটো রিকশা চলাচল বন্ধ করে দিয়ে শতাধিক চালক বিক্ষোভ করে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অটো রিকশার মেরামত খরচ বৃদ্ধি পরিস্থিতি বিবেচনায় ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে নামেন চালকরা। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নিয়ে অটো চলাচলে বাধা দেয় তারা।
এসব বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দমাতে মাঠে নামে মহানগর ইজিবাইক মালিক শ্রমিক কল্যাণ সমবায় সমিতি ও মহানগর ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়রে গুটিকয়েক নেতা-কর্মীও। তাদের দাবি, নগর সড়কে উত্তাপ ছড়াতেই বিএনপি-জামাতের পরিকল্পনায় চালকরা রাজপথে নেমেছে।
তবে বিক্ষুব্ধ অটোরিকশা চালকরা বলছেন, আমরা আমাদের পেটের ক্ষুধা মেটাতে মাঠে নেমেছি। কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশয়ে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উর্ধ্বগতি ও অটো মেরামতসহ সার্বিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। একারণেই তারা ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাঠে নেমেছেন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামানের দ্বারস্থ হয়েছেন।
তাদের দাবি, নামমাত্র চাঁদাবাজ সংগঠন কখনোই শ্রমিকের কথা ভাবেনি। চাঁদাবাজি করে নিজের আখের গুছিয়েছে। এখন মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে।
আন্দোলন চলাকলীন পরিস্থিতি পর্যালোচনাতেও দেখা যায়, অটো চালকদের এই আন্দোলনে নির্দিষ্ট কোনো নেতা বা আহ্বায়ক ছিলেন না। সেখানে কয়েকজন সবার সঙ্গে আলোচনা করে উপস্থিত রাসিক কাউন্সিলরদের নিজেদের দাবিগুলো তুলে ধরেছেন। এছাড়া কাউন্সিলররা বারবার আন্দোলনকারীদের মধ্যে থেকে কয়েকজন প্রতিনিধিকে সিটি করপোরেশনে বসে আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছিলেন। তবে উপস্থিত চালকরা সকল শ্রমিকদের উপস্থিতিতেই আলোচনার কথা বলেন। অন্যথায় আলোচনায় বসা হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে সম্মতি দেন উপস্থিত চালকরা। এরই অংশ হিসেবে সোমবার (২৯ আগস্ট) দুপুর আড়াইটায় আন্দোলনকারী চালকদের সঙ্গে তাদের দাবি নিয়ে মেয়রের আলোচনার কথা হবে বলে জানা গেছে।
তবে আহ্বায়ক কিংবা উদ্যোক্তা ছাড়াই কি অটো চালকরা রাজপথে নেমেছেন? এমন প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আন্দোলন চলাকালে কয়েকজন শ্রমিক জানান, গত সপ্তাহ থেকেই এটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আর একটি প্রিন্ট করা ‘প্রচারণা পত্র’ এর মাধ্যমে চালকদের এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। তবে এই ‘প্রচারণা পত্র’ কে তৈরি করেছে? কে বিলি করেছে? এ বিষয়ে কেউ নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে রাসেল নামের এক চালককে। তিনি জানান, তারা একটি প্রিন্ট করা প্রচারণা পত্রের মাধ্যমে এই ধর্মঘট সম্পর্কে জানতে পারেন। তবে কে এটা তৈরি করেছে সেটা জানি না। আর আমরা নিজের কষ্টের জায়গা থেকে ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করেছি। আমি এই ধর্মঘটের নেতৃত্বে নাই। এখানে সবাই নেতৃত্ব দিচ্ছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রাশেদুজ্জামান রাশেদ বলেন, আমাদের ১৫-২০ লোককে আহত করা হয়েছে। শ্রমিকরা আমাদের ভাই। তবে এখানে অদৃশ্য কোনো শক্তি কাজ করছে কিনা এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি।
এদিকে এ বিষয়ে অবগত নয় অটো রিকশা চালকদের দুই সংগঠন। আন্দোলন নিয়ে এই সংগঠন দুটির সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। যা নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশনও।
এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর ইজিবাইক মালিক শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি শরিফুল ইসলাম সকালে জানিয়েছিলেন, এটা বিএনপি-জামাতের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। নগর সড়কে উত্তাপ সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চলছে। এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিক্ষোভ চলাকালে মহানগর ইজিবাইক মালিক শ্রমিক কল্যাণ সমবায় সমিতি ও মহানগর ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের নামে চাঁদাবাজি ও ভুঁইফোড় নেতৃত্বের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা হাসিলের অভিযোগ করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। শ্রমিকদের দাবি, এই সংগঠনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা শ্রমিক না। সংগঠন খুলে বসে সাধারণ অটো রিকশা চালকদের থেকে জোর করে চাঁদা আদায় করে এই সংগঠন। বিভিন্ন জনের কাছে অবৈধ সুবিধা নিয়ে ফুলে-ফেঁপে নেতাগিরি করে বেড়ায়। এসি রুমে বসে চাঁদাবাজি করে।
এ বিষয়ে মহানগর ইজিবাইক মালিক শ্রমিক কল্যাণ সমবায় সমিতির সভাপতি শরিফুল ইসলাম অসুস্থ থাকায় শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রাশেদুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তবে এমন অভিযোগের বিষয়ে মহানগর ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রাশেদুজ্জামান রাশেদ অস্বীকার করে বলেন, আমরা তাদের দাবির সঙ্গে একমত। তবে তাদের অভিযোগগুলো সত্য না।
এ বিষয়ে রাসিকের রাজস্ব কমিটির সদস্য ও ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল মোমেন জানান, আগে তো প্রতিটা মোড়ে মোড়ে কিছু প্রভাবশালী চাঁদাবাজি করতো। এখন সেটা নেই। এই দুই সংগঠনের চাঁদাবাজির বিষয়ে জানা নেই। তবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হবে।