রাজশাহী সিটি নির্বাচন

মনোনয়নপত্র টেকাতে এক পরিবারে একাধিক প্রার্থী

রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে প্রার্থিতা টিকিয়ে রাখতে ‘পারিবারিক কৌশল’ অবম্বলন করেছেন একাধিক প্রার্থী। কৌশলের অংশ হিসেবে একই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী হতে বাবা-ছেলে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আরেক ওয়ার্ডে চাচা-ভাতিজা, অন্য ওয়ার্ডে দুই ভাই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যাচাই-বাছাইয়ে যাতে একজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও আরেকজনেরটা বহাল থাকে, সেজন্যই এই কৌশল নিয়েছেন তারা।

সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২১ নম্বর ওয়ার্ডে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন মহানগর যুবলীগের সহ-সভাপতি ফারুক হোসেন। ফারুকের সঙ্গে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তার ভাতিজা মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রায়হানুর রহমান রয়েল।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রয়েলের বাবা রমজান আলী মহানগর যুবলীগের সভাপতি। এই ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর নিযাম-উল-আযীম। তিনিও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে তাকে ছাড় দিতে নারাজ যুবলীগ সভাপতির পরিবার। তাই একজনের মনোনয়নপত্র টিকিয়ে রাখতে একই পরিবারের দুই জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে। এতে ২১ নম্বর ওয়ার্ডের তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

চাচার সঙ্গে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে রায়হানুর রহমান রয়েল বলেন, ‘আমরা দুই জন শেষ পর্যন্ত প্রার্থী থাকবো না। যেকোনো একজন নির্বাচন করবো। যেহেতু দুই জনেরই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, সেহেতু এখন পারিবারিকভাবে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কে ভোট করবে।’

২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আরমান আলীর মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়ার আশা ছিল না। তাই নিজের পাশাপাশি ছেলে আতিকুর রহমানের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যাচাই-বাছাইয়ে অবশ্য দুই জনেরই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর আরমান আলী বলেন, ‘ছেলেকে দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু সে তো নির্বাচন করবে না। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবে। নির্বাচন আমিই করবো। 

এই ওয়ার্ডে সাখাওয়াত হোসেন ও জাহাঙ্গীর আলম নামে আরও দুই জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তাদের মনোনয়নপত্রও বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. আকতারুজ্জামান। তার মনোনয়নপত্র বাতিলের শঙ্কা ছিল। হয়েছেও তাই। সেজন্য আকতারুজ্জামানের ভাই সারোয়ার জাহান মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যাচাই-বাছাইয়ে আকতারুজ্জামানের প্রার্থিতা বাতিল হলেও টিকে আছেন সারোয়ার। আকতারুজ্জামান প্রার্থিতা ফিরে না পেলে সারোয়ারই প্রার্থী হবেন।

এ বিষয়ে আকতারুজ্জামান বলেন, ‘আমি একজনের ঋণের গ্যারান্টর ছিলাম। আমার চেক জমা দিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। আমার চেকও ফেরত পেয়েছি। তবে ব্যাংক বলেছে, ওই ঋণগ্রহীতা ঋণখেলাপি। এজন্য আমার প্রার্থিতা বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমি আপিল করবো।’

আমার ভাইয়ের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে উল্লেখ করে আকতারুজ্জামান বলেন, ‘আমি প্রার্থিতা ফিরে পেলে সে নির্বাচন করবে না। তবে প্রার্থিতা ফিরে না পেলে সে নির্বাচনি মাঠে থাকবে।’

এই ওয়ার্ডে আখতার আহম্মেদ বাচ্চু, মোখলেসুর রহমান খলিল, মহিউদ্দিন বাবু, মাসুদ রানা ও রবিউল ইসলাম নামে আরও পাঁচ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রাসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেনের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। প্রার্থীদের উপস্থিতিতে মনোনয়নপত্র বৈধ বা বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন।

এই নির্বাচনে চার মেয়র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তারা হলেন—আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সদ্য সাবেক সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, জাতীয় পার্টির সাইফুল ইসলাম, জাকের পার্টির লতিফ আনোয়ার ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মুরশিদ আলম।

রিটার্নিং কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘চার মেয়র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া ১০টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে ৪৬ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছি। তবে ৩০টি সাধারণ ওয়ার্ডে সাত কাউন্সিলর প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এখন বৈধ প্রার্থী রয়েছেন ১১৭ জন।’

ঋণখেলাপি, জামিনদার, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি এবং সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে ওই সাত জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে বলেও জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, ‘আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তারা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করতে পারবেন। আপিল কর্মকর্তা তিন দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
আগামী ১ জুন পর্যন্ত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারবেন। ২ জুন বৈধ প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। ২১ জুন ইভিএমের মাধ্যমে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করা হবে।’ 

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী সিটিতে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭১ হাজার ১৮৫ জন। নারী ভোটার ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৭২ জন। এবার নতুন ভোটার ৩০ হাজার ১৫৭ জন। ১৫২টি কেন্দ্রের ১ হাজার ১৭৩টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে।