রাজশাহীতে ভোজন রসিকদের কাছে ‘কালা ভুনা’ মাংস জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নগরীর উপকণ্ঠে কাটাখালি, পবা উপজেলার ব্রিজের নিচে ও সিটি হাটসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় কালা ভুনা বিক্রি করা হচ্ছে। জনপ্রিয়তা থাকায় কালা ভুনার বিশেষ আইটেম নিয়ে নতুন নতুন হোটেল-রোস্তরাঁও গড়ে উঠছে।
এদিকে কোরবানির গরু কিনতে এসে কালা ভুনার স্বাদ নেওয়া এক প্রকার রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশু হাটকে কেন্দ্র করে কালা ভুনা বিক্রি জন্য অন্তত ১০-১৫ টি হোটেল গড়ে উঠেছে। আর স্থায়ীভাবে রয়েছে আরও হেটেল।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে রাজশাহীর গ্রামে ফ্রিজের প্রচলন ছিল না। তখন কোরবানির মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণের কোনও আধুনিক উপায় ছিল না। তবে সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে কালা ভুনা পদ্ধতি অবলম্বন করে রান্না করা মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যেতো। যা বর্তমানে বিশেষায়িত খাবার হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
আগে ঈদুল আজহা এলে শহর ও গ্রামের মানুষ গোটা পশু একা কিনতেন। আবার অনেকে সাত ভাগে কোরবানি দেওয়ার চেষ্টা করতেন। আর সেই সময় রান্না করা মাংস সংরক্ষণের জন্যই কালা ভুনা করা হতো।
৭০ বছর ছুঁই ছুঁই রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ এলাকার গৃহিনী মুর্শিদা বেগম জানান, সাত ভাগের কোরবানির মাংস তো দুই-তিন দিনে শেষ করা যায় না। আবার বর্তমান যুগের মতো আগে বাড়িতে ফ্রিজও ছিল না। তাই কোরবানির দিন বাড়িতে মাংস নিয়ে আসলে তা একসঙ্গে মসলা ছাড়াই কষিয়ে রান্না করে রাখা হতো। সেই মাংস প্রত্যেক দিন খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে পর্যায়ক্রমে রান্না করা হতো। আর বাকি মাংস চুলায় গরম করে প্রক্রিয়াজাত করে রাখা হতো। এতে করে প্রত্যেক দিন গরম করে রাখার জন্য মাংসের লাল অংশটা এক সময় উঠে গিয়ে কালো রং ধারণ (এখন আমরা কালা ভুনা বলছি) করতো। শুধু তাই নয়, মাংস যাতে নষ্ট না হয়। সেজন্য মাটির হাড়িতে করে ঠান্ডা জায়গায় ঝুলিয়ে রাখা হতো। যাতে করে পোকামাকড় কিংবা বিড়াল-কুকুর না খেতে পারে।
গৃহিনী মুর্শিদা বেগম আরও জানান, নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন ইউটিউব দেখে কালা ভুনা রান্না করে। আর বাড়িতে ঘরে ঘরে ফ্রিজ হয়ে গেছে। তাই তারা কোরবানি মাংস সংরক্ষণ করে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন উৎসবে কালা ভুনাসহ নানা পদের খাবার রান্না করে। সেইসঙ্গে মাংসের স্বাদের জন্য বাজারের বিভিন্ন ধরনের মসলা ব্যবহার করে। এজন্য বাড়ির মালিকরা সাধ্যমতো গোটা পশু কোরবানি দেন।
পবা উপজেলার নওহাটা ব্রিজের নিচে প্রত্যেক দিন গরুর মাংসের কালা ভুনা বিক্রি করেন আব্দুল মান্নান। তিনি জানান, বাজারে বিভিন্ন ধরনের মসলা পাওয়া যায়। সে মসলা ব্যবহার করে লাল মাংসকে কালো রংয়ে পরিণত করা যায়। দীর্ঘদিন ধরে চুলায় জ্বাল দিয়ে মাংস কালো রংয়ের করার প্রয়োজন পড়ে না। আর এই মসলা মাংসের স্বাদকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আর রাঁধুনি ভেদে কালা ভুনার স্বাদও একেক জায়গায় একেক রকম হয়।
মঙ্গলবার (২৭ জুন) হাটে গরু কিনতে গিয়ে সেই রীতিই যেন পালন করছিলেন নগরীর টুলটুলিপাড়া এলাকার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোরবানি গরু কেনার জন্য হাটে এসেছি। কিন্তু গরু বাসায় রাখার জন্য ঈদের একদিন আগে কিনেছি। তবে তার আগে দুই-তিন সিটি হাটে আমাদের পরিবারের সবাই ঘোরাঘুরি করি। তখন দুপুর হলে এখানে কালা ভুনা দিয়ে ভাত খেয়ে বাড়ি ফিরে যায়। আর হাটে এসে কালা ভুনা খেয়ে যান না এমন ভোজন রসিক নেই। হাট ছাড়াও মাঝেমধ্যেই বন্ধুরা মিলে এখানে আসি। মাঝেমধ্যে কাটাখালিতেও যাওয়া হয়।
নগরীর বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা দ্বীপা প্রজ্ঞা বলেন, ‘এখান থেকে কাটাখালির দূরত্ব কম। তাই মুখের স্বাদের ভিন্নতা আনতে স্বামীসহ মাঝেমধ্যে কালা ভুনা খেতে যায়। কারণ বাড়ির চেয়ে হোটেলের কালা ভুনার স্বাদ অনেক বেশি।’
কাটাখালিতে দুইটি হোটেলে কালা ভুনা বিক্রি হয়। একটি ইব্রাহিম ও আরেকটি একতা হোটেল। এই দুই হোটেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যান। এছাড়া চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কাজলা এলাকাতেও কালা ভুনার বিশেষায়িত হোটেল দেওয়া হয়েছে।