বগুড়ায় পদযাত্রা থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাস ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির ২১১ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চারটি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা ও সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর তালুকদারসহ দলের ২১১ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও অনেক নেতাকর্মীকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ জুলাই) রাতে পুলিশ বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় তিনটি ও দুপচাঁচিয়া থানায় একটি মামলা করেছেন ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত বাসচালক মো. ফেরদৌস। এরই মধ্যে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার (১৯ জুলাই) এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী।
সদর থানার ওসি সাইহান ওলিউল্লাহ বলেন, ‘মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে অভিযান চালিয়ে আলী আজগর তালুকদারকে শহরের সূত্রাপুরের বাসা থেকে এবং রাত সাড়ে ৩টার দিকে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাজেদুর রহমানকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তারা পদযাত্রা ও হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এসব হামলায় পুলিশের অন্তত ১০ সদস্য আহত হয়েছেন।’
সদর থানা পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার দুপুরে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর তালুকদারের নেতৃত্বে শহরের বনানী থেকে পদযাত্রা কর্মসূচি শুরু হয়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পদযাত্রাটি ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মোড়ে পৌঁছালে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুর রশিদের নেতৃত্বে ব্যারিকেড দিয়ে জলেশ্বরীতলা কালীমন্দির হয়ে দলীয় কার্যালয়ের দিকে যেতে বলা হয় নেতাকর্মীদের। কিন্তু নেতাকর্মীরা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে সাতমাথার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বাধে। এ অবস্থায় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ১০ রাউন্ড টিয়ারশেল ও ২০টি রাবার বুলেট ছুড়েছে পুলিশ। অপরদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। একপর্যায়ে পুলিশের ওপর হামলা এবং ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে
ভাঙচুর করা হয়। সেইসঙ্গে ১৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে নারুলি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ তরিকুল ইসলামকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হয়। তাদের হামলায় পুলিশের তিন নারী সদস্যসহ ১০ জন আহত হন।
হামলায় আহত ডিবি পুলিশের এসআই আশিকুর রহমান ও তরিকুল ইসলামসহ কয়েকজনকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় আলী আজগর তালুকদারকে প্রধান আসামি করে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ৪৯ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেন বগুড়ার বনানী পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। এ মামলায় আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
ওসি সাইহান ওলিউল্লাহ বলেন, ‘একই দিন দুপুর দেড়টার দিকে সদর পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে আলী আজগর তালুকদারকে প্রধান আসামি করে ২৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। সদর পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক শহীদুল ইসলাম বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে এ মামলা করেছেন। ওই দিন বিকাল পৌনে ৩টার দিকে শহরের নবাববাড়ি সড়কে পুলিশের ওপর ককটেল হামলার অভিযোগে আরেকটি মামলা করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি ও পৌর মেয়র রেজাউল করিমকে প্রধান আসামি করে ১১৪ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন সদর থানার উপপরিদর্শক আবদুল মালেক।’
তিন মামলার অন্যতম আসামিরা হলেন—জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা, সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর তালুকদার, সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলাম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন চাঁন, এমআর ইসলাম স্বাধীন, হামিদুল হক চৌধুরী হিরু, কেএম খায়রুল বাশার, সহিদ উন নবী সালাম, এবিএম মাজেদুর রহমান, খাদেমুল ইসলাম খাদেম, অ্যাডভোকেট একেএম সাইফুল ইসলাম, সাবেক এমপি মোশারফ হোসেন, লাভলী রহমান, জাহাঙ্গীর আলম, আবু হাসান, নূরে আলম সিদ্দিকী রিগ্যান ও আদিল শাহরিয়ার গোর্কি।
অপরদিকে, বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে বাস ভাঙচুরের অভিযোগে আদমদীঘি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবদুল মুহিত তালুকদারসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছেন শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের চালক মো. ফেরদৌস।
বিষয়টি নিশ্চিত করে দুপচাঁচিয়া থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকাল পৌনে ৩টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কে শাহ ফতেহ আলী পরিবহনসহ দুটি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে এই মামলায়। এ ঘটনায় তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন মো. আবু বক্কর, মো. তামিম ও মো. রাজু। বুধবার সকালে আদালতের মাধ্যমে তাদের বগুড়া কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
জেলা পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের ওপর হামলা, ফাঁড়িতে হামলা, সরকারি কাজে বাধা, ভাঙচুরের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনসহ বিভিন্ন ধারায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।’
সদর থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলা, ফাঁড়িতে ভাঙচুর ও ককটেল হামলার ঘটনায় বিএনপির ১৮৯ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সদর থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। পুলিশ বাদী হয়ে এসব মামলা করেছে। এর মধ্যে ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয় মোড়ের ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ৪৯, সদর পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে ২৬ ও নবাববাড়ি সড়কে পুলিশের ওপর ককটেল হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ১১৪ জনকে মামলার আসামি করা হয়। এসব মামলায় দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বুধবার বিকালে তাদের আদালতে হাজির করে পাঁচ দিন করে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। তবে রিমান্ড শুনানি হয়নি।’
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, ‘পুলিশ আমাদের শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় হামলা, গুলি ও লাঠিচার্জ করেছে। এতে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধসহ ২০০ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের টিয়ারশেলে ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক ছাত্রী অসুস্থ হয়েছেন। পুলিশের ওপর ককটেল কিংবা কোনও ধরনের হামলা করা হয়নি।’