দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে নওগাঁর পাঁচটি আসনে। আবার সেই সঙ্গে বাড়ছে আতঙ্কও। এখানে মূলত আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। যদিও সব আসনে জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দল অংশ নিয়েছে, তবে মূল লড়াই হবে নৌকা ও ট্রাক প্রতীকে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীসহ সমর্থকদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।
এদিকে কয়েকটি পক্ষ-প্রতিপক্ষের নির্বাচনি অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। তবে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ হওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে মৌন বিরোধ ও বিভেদের সৃষ্টি হয়েছে। তাই সব আসনেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
তবে সবার চাওয়া, নওগাঁর সব আসনেই প্রভাবমুক্ত, সংঘাত ও সহিংসবিহীন নির্বাচন হোক। উত্তেজনাকর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন হয় শান্তিপূর্ণ, এমনটাই চাওয়া ভোটারদের। পাশাপাশি সবাই যেন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে তাদের ভোট দিতে পারে, তাই নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সবাই ও আইশৃঙ্খলা বাহিনীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তারা।
১১টি উপজেলা নিয়ে গঠিত নওগাঁর সংসদীয় আসন ছয়টি। এই ছয়টি আসনের মোট ভোটার ২২ লাখ ১৯ হাজার ২৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১১ লাখ ৬ হাজার ২৫৬, নারী ১১ লাখ ১৩ হাজার ২৫ এবং হিজড়া ভোটার ১০ জন। এ ছাড়া এবার ভোটকেন্দ্র বেড়েছে বলে জানা গেছে নির্বাচন অফিস সূত্রে।
উল্লেখ্য, এবার নওগাঁ-২ (পত্নীতলা-ধামইরহাট) আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।
নওগাঁ-১ (নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার)
ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা আসন নওগাঁ-১। এই আসনের ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৯০১ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৮৯৬ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ২৬ হাজার ৫ জন। এর মধ্যে নিয়ামতপুরে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৮ হাজার ৩৩৮ জন, পোরশায় ১ লাখ ৫ হাজার ২০৬ এবং সাপাহারে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৫৭ জন।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছালেক চৌধুরীকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাধন চন্দ্র মজুমদার। আর ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাধন চন্দ্র মজুমদার। এবারও নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করছেন তিনি।
এই আসনে পোরশা উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আকবর আলী কালু (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিয়ামতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান খালেকুজ্জামান তোতা (ট্রাক) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাজেদ আলী (ঈগল)। এখানে মূলত লড়াই হবে নৌকা ও ট্রাক প্রতীকের মধ্যে। এলাকায় উন্নয়ন করার ফলে খাদ্যমন্ত্রীর এবারও জয়লাভ করার সম্ভাবনা আছে বলে জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা।
নওগাঁ-২ (পত্নীতলা-ধামইরহাট)
এই আসনের ভোট স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। গত ২৯ ডিসেম্বর নওগাঁ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল হক মৃত্যুবরণ করেন। এরপর নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার এই আসনের নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেন।
এই আসনের আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন বর্তমান সংসদ সদস্য শহিদুজ্জামান সরকার বাবলু। স্বতন্ত্র প্রার্থী নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল হক ও জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ড. এইচ এম আখতারুল আলম, জাতীয় পার্টির দলীয় প্রার্থী নওগাঁ জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তোফাজ্জল হোসেন।
নওগাঁ-৩ (মহাদেবপুর-বদলগাছী)
এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দিন তরফদার সেলিম। এবার আওয়ামী লীগ থেকে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তিনি। এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য ও সাবেক সিনিয়র সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী সৌরেন, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মাসুদ রানা (লাঙ্গল), তৃণমূল বিএনপি’র প্রার্থী সোহেল কবির চৌধুরী (সোনালী আঁশ), স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহফুজা আকরাম চৌধুরী (ঈগল) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ছলিম উদ্দিন তরফদার সেলিম (ট্রাক)। এ ছাড়া হাইকোর্টে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন শামীনুর রহমান ওরফে চিকন আলী। এই কৌতুক অভিনেতা (কেটলি) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়বেন।
এখানে মূলত লড়াই হবে নৌকা ও ট্রাক প্রতীকে। তবে দ্বিমুখী লড়াই হলেও ক্লিন ইমেজের হওয়ায় নৌকার প্রার্থী সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তীর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। কারণ দুই দফায় একনাগাড়ে ক্ষমতায় থাকার কারণে এমপি সেলিম মহাদেবপুর ও বদলগাছী সংসদীয় এলাকায় একটি নির্দিষ্ট বলয় তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য দলের একসময়ের বলিষ্ঠ ও ত্যাগী নেতাদের কৌশলে দলের কমিটি থেকে বাদ দিয়ে তাদের কোণঠাসা করে রাখার অভিযোগ রয়েছে বর্তমান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দিন তরফদার সেলিমের বিরুদ্ধে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে সংসদীয় এলাকায় তিনি নিজে সরাসরি অনৈতিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ না করলেও তার ছেলে সাকলাইন মাহমুদ রকি, ভাগ্নে শাকিল তরফদার ও নির্ধারিত কতিপয় দলীয় নেতাকর্মী এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড হস্তক্ষেপ করতেন।
নওগাঁ-৩ আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯০৬ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৩ জন আর নারী ভোটার ২ লাখ ১১ হাজার ২২৩টি।
নওগাঁ-৪ (মান্দা)
জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা মান্দা উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নওগাঁ-৪। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩লাখ ১৮ হাজার ৭০০ জন। তার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫৮ হাজার ১৯৭ জন এবং নারী ১ লাখ ৬০ হাজার ৫০৩ জন।
এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক। তাকে দল থেকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট প্রার্থী নাহিদ মোর্শেদ, জাতীয় পার্টির আলতাফ হোসেন (লাঙ্গল), বাংলাদেশ কংগ্রেস পাটির আব্দুর রহমান (ডাব), স্বতন্ত্র জেলা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক এস এম ব্রুহানী সুলতান মামুদ গামা (ট্রাক) এবং স্বতন্ত্র বর্তমান সংসদ সদস্য ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক (ঈগল)। তবে লড়াই হবে নৌকা ও ট্রাক প্রতীকের মধ্যে।
নওগাঁ-৫ (নওগাঁ সদর)
এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন জলিল জন। এবারও তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করছেন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইফতারুল ইসলাম বকুল (লাঙ্গল), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের প্রার্থী এস এম আজাদ হোসেন মুরাদ (মশাল) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান ছেকার আহমেদ শিষাণ (ট্রাক)।
এখানে নৌকা ও ট্রাকের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই হবে। দেড় যুগ ধরে নওগাঁ পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান ছেকার আহমেদ শিষাণ ও বর্তমান সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন জলিল জনের মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে এই আসনে উত্তেজনা ও আশঙ্কাও বিরাজ করছে।
উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ৯২৫ জন। তার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৫৫ জন এবং নারী ১ লাখ ৭১ হাজার ৩৭০ জন।
নওগাঁ-৬ (রাণীনগর-আত্রাই)
দুই উপজেলায় মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৩৫ জন। তার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৭ জন, নারী ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭১ জন এবং হিজড়া ২ জন।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন প্রয়াত ইসরাফিল আলম। তিনি ২০২০ সালের ২৭ জুলাই মারা যান। এরপর উপনির্বাচনে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হেলাল নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। এবারও দ্বিতীয়বারের মতো তাকে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা।
এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু বেলাল হোসেন জুয়েল (লাঙ্গল), তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী পি কে আব্দুর রব (সোনালী আঁশ), বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী সরদার মো. আব্দুস সাত্তার (ডাব), ন্যাশনাল পিপলস পাটি (এনপিপি) প্রার্থী খন্দকার ইন্তেখাব আলম (আম), স্বতন্ত্র প্রার্থী জাহিদুল (ঈগল), স্বতন্ত্র প্রার্থী নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক সুমন (ট্রাক) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নওশের আলী (কাঁচি) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনি মাঠে লড়ছেন। এখানেও মূলত দ্বিমুখী স্বতন্ত্র সুমন ও হেলালের মধ্যে লড়াই হবে। লড়াই হবে নৌকা ও ট্রাক প্রতীকে।
তবে সব আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর। ফলে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। কার পক্ষে নির্বাচন করবেন, সেই ভাবনায় রয়েছেন তারা এবং নির্বাচন-পরবর্তী কী হবে, এমন হিসাব-নিকাশ কষছেন তারা। তাই কেউ কেউ পছন্দের প্রার্থীর হয়ে প্রকাশ্যে নির্বাচনি গণসংযোগে অংশ নিলেও, অনেকে আছেন অদৃশ্য হয়ে।