ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে পাবনা জেলায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। পাবনা-৩ (চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর) ও পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী) আসনে দলীয় মনোনীত প্রার্থীদের চেয়ে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অবস্থান শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যুবদল, ছাত্রদল ও অন্য অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দলীয় কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য করে দলের মনোনীত প্রার্থীদের ত্যাগ করে বিদ্রোহীদের পক্ষে যোগ দিচ্ছেন। এতে বিএনপির নির্বাচনি কৌশল প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
পাবনা-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন। চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার যুবদল এবং ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলামের বাসভবন চত্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষ ত্যাগের ঘোষণা দেন।
তারা অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৃণমূল নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে বহিরাগত প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দলে ভিড়িয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে, যা তাদের জন্য অপমানজনক।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নেতারা বলেন, যারা ১৭ বছর রাজপথে ছিলাম, জেল-জুলুম খেটেছি, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম, তারাই আজ এখানে উপস্থিত আছি। এখানে কোনও নব্য বিএনপি নেই। আমরা স্থানীয় প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছি, কারণ তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা কোনও বহিরাগত প্রার্থীকে চাই না। সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম দীর্ঘদিন চাটমোহরের রাজপথে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। তার মনোনয়নের জন্য আমরা দাবি করেছিলাম। কিন্তু কেন্দ্র তা না মেনে হাসান জাফির তুহিনকে মনোনয়ন দিয়েছে।
তারা আরও বলেন, গত ১৭ বছর এ দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেননি। এবার ভোট উৎসব হবে। কিন্তু দল ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে বহিরাগতকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমরা ধানের শীষের মানুষ, ধানের শীষই আমাদের প্রাণ। কিন্তু ধানের শীষের যিনি প্রার্থী, তিনি আমাদের কোনও মূল্যায়ন না করে আওয়ামী-ফ্যাসিস্টদের দলে ভিড়িয়েছেন। চাটমোহরের মাটিতে আমাদের নাড়ি পোঁতা, চাটমোহরের মানুষকে সঙ্গে নিয়েই বাঁচবো, তাদের সঙ্গে নিয়েই মরবো। আমরা চাটমোহরের মানুষকে নেতা ও এমপি হিসেবে চাই। আজকে আওয়ামী লীগ নেতাদের দলে ভেড়ানো হচ্ছে, এতে আমাদের হৃদয় ভেঙে গেছে। চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুরের সাধারণ মানুষের পালস আমরা বুঝেছি। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য, বিএনপিকে বাঁচানোর জন্যই স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আমরা ঘোড়া মার্কাকে বিজয়ী করেই ঘরে ফিরবো।
সংবাদ সম্মেলনে চাটমোহর পৌর বিএনপির সদস্য বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম তাইজুলের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন- চাটমোহর উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ফারুক হোসেন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক তানভীর জুয়েল লিখন, চাটমোহর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম রাহুল, উপজেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরান হোসেন, সদ্য বহিষ্কৃত উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আরিফুল ইসলাম আরিফ, সদ্য বহিষ্কৃত উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান লেবু, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক খায়রুল আলম, উপজেলা শ্রমিক দলের নেতা শাহজাহান আলী, ছাত্রদল নেতা মাসুম আকাশ, রুহুল, উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হৃদয়, যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক, শাকিব, যুবদল নেতা সোহাগ, জনি, আব্দুল আলিম, স্বেচ্ছাসেবক দলের রনি, পলাশ প্রমুখ।
এই ঘোষণা বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর সমর্থন ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে, যেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলামের পক্ষে তৃণমূল নেতৃত্বের বড় অংশ যোগ দিয়েছে।
এদিকে, পাবনা-৪ আসনে একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টুর নির্বাচনি প্রচারণায় জড়িত থাকার অভিযোগে ঈশ্বরদী পৌর যুবদলের আহ্বায়কসহ ছয় যুবদল নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-দফতর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অমান্য করে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের মাধ্যমে স্বতন্ত্র প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টুর পক্ষে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়ায় এই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বহিষ্কৃত নেতারা হলেন- ঈশ্বরদী পৌর যুবদলের আহ্বায়ক জাকির হোসেন জুয়েল, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম রিপন, আক্তারুজ্জামান রাজু, এনামুল হক আতিয়ার, মাহমুদ হাসান সোনামনি ও উপজেলা যুবদলের সদস্য মতিউর রহমান।
যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম নয়নের নির্দেশে তাদের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বহিষ্কৃত নেতারা শুরু থেকেই জাকারিয়া পিন্টুর নির্বাচনি প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন। তারা ধানের শীষের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে দলকে বিতর্কিত করে আসছিলেন।
ঈশ্বরদী উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সুলতান আলী বিশ্বাস টনি বলেন, দল থেকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সবমিলিয়ে, পাবনা-৩ ও পাবনা-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের চেয়ে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অবস্থান অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। যুবদল এবং ছাত্রদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সংগঠনের নেতৃত্বের যোগদান এবং বহিষ্কারের ঘটনা তৃণমূল স্তরে অসন্তোষের বাস্তব ফলাফল। এতে নির্বাচনি মাঠে বিদ্রোহীদের সমর্থন বাড়ছে, যা বিএনপির কেন্দ্রীয় কৌশলকে চ্যালেঞ্জ করছে। স্থানীয় নেতারা মনে করেন, এই সংকট না মেটালে দলের নির্বাচনি ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।