ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের নিয়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নীলফামারী অভিমুখী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি বগুড়ার আদমদীঘিতে লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত ৬৬ জন। স্টেশন মাস্টারের দেওয়া সংকেত অমান্য করার কারণে এবং চালকের ভুলে বুধবার (১৮ মার্চ) বেলা আড়াইটার দিকে সান্তাহার জংশনের অদূরে বাগবাড়ি এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেসের বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি। ওই লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আদমদীঘি স্টেশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা এখন পর্যন্ত আহত ৪৮ জনকে উদ্ধার করেছেন। আর রেলপথ মন্ত্রণালয় বলছে, আহত মানুষের সংখ্যা ৬৬। বগি লাইনচ্যুত হলে ছাদে ও বগির ভেতরে থাকা ওসব যাত্রী আহত হন। তাদের নওগাঁ জেলা হাসপাতাল ও আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি
সন্ধ্যা ৬টার দিকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি। এ অবস্থায় উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলা–নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। দিনাজপুরের হিলির উর্ধতন উপসহকারী প্রকৌশলী ভবেশ চন্দ্র, সান্তাহার রেলওয়ে থানার ওসি হাবিবুর রহমান ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এসব তথ্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন।
সংকেত অমান্য করেন চালক
চালক সংকেত অমান্য করার কারণে এবং চালকের ভুলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী সান্তাহার জংশন স্টেশনের অধীনে দায়িত্বে থাকা ওয়েম্যান সোহেল বিষয়টি জানিয়েছেন।
বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহাম্মেদ হোসেন মাসুম। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি উদ্ধারে পার্বতীপুর ও ঈশ্বরদী থেকে দুটি উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে এসেছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী ও দুর্ঘটনাকবলিত যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাগবাড়ি এলাকায় রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল। ওই স্থানে লাল নিশানা টাঙানো ছিল। ঢাকা থেকে নীলফামারীগামী আন্তনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঈদে ঘরমুখী যাত্রীতে ভরা ছিল। ট্রেনটি সান্তাহার জংশনে যাত্রাবিরতির পর আক্কেলপুর রেলস্টেশনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সান্তাহার জংশনের দুই কিলোমিটার উত্তরের বাগবাড়িতে এসে ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ সময় ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীরা নিচে পড়ে আহত হন। এ ছাড়া বগির ভেতরে থাকা অনেক যাত্রীও আহত হন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট এসে আহত ৪৮ যাত্রীকে উদ্ধার করেছে। দুর্ঘটনার পর ঈদে ঘরমুখী ট্রেনযাত্রীরা চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন। তারা বিভিন্ন যানবাহনে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ট্রেনটির ৯টি বগির লাইনচ্যুত হয়ে আছে। কয়েকটি বগির চাকা লাইন ছেড়ে পাথরের ওপর। ট্রেনটি কয়েকটি বগি আঁকাবাঁকা হয়ে রয়েছে। রেললাইন উপড়ে গেছে।
রেললাইনে আগে থেকেই ত্রুটি ছিল
সান্তাহার রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুন বলেন, ‘রেললাইনে আগে থেকেই ত্রুটি ছিল। বেলা আড়াইটার দিকে সান্তাহার প্ল্যাটফর্মের অদূরে ট্রেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ রুটে আপাতত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দুটি রিলিফ ট্রেন এসেছে। রাত ৮টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি।’
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কমিটি গঠন
রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহাম্মেদ হোসেন মাসুম বলেন, ‘দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে কার দোষ, সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে। দ্রুত মেরামত করে রেললাইন সচল করা হবে। আজ রাতের মধ্যে কাজ শুরু হবে।’
আহত ৬৬ জন
এদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার ট্রেনটি ঢাকা থেকে চিলাহাটির উদ্দেশে সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে যায়। সান্তাহার স্টেশন পার হয়ে তিলকপুর স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় ব্যানার সিগন্যাল অনুসরণ না করায় বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার বাগমারী এলাকায় ৯টি কোচ লাইনচ্যুত হয়। এতে আহত হন ৬৬ জন। এর মধ্যে নওগাঁ সদর হাসপাতালে ২০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন, ৪০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং ছয় জনকে বগুড়া আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
লাইনটির মেরামত চলছিল
প্রত্যক্ষদর্শী ও সান্তাহার জংশন স্টেশনের কর্মীরা জানিয়েছেন, বুধবার সকাল থেকে সান্তাহার জংশনের ওয়েম্যান ও অন্যরা লাইনটি মেরামত করছিলেন। এ সময় স্টেশন মাস্টার ঢাকা ছেড়ে আসা পার্বতীপুরের চিলাহাটিগামী আন্তঃনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের চালককে গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বার্তা দেন। পাশাপাশি ঘটনাস্থলে রেলেরকর্মীরা লাল ব্যানার দিয়ে রাখেন। বেলা আড়াইটার দিকে বাগবাড়ি এলাকায় পৌঁছে নীলসাগর এক্সপ্রেস। ওই সময় স্টেশন মাস্টার ও ওয়েম্যানদের বার্তা এবং লাল ব্যানারের সংকেত অমান্য করে ট্রেন চালিয়ে যান চালক। পরে ট্রেনের পেছনের এসি চেয়ার, শোভন চেয়ার, পারওয়ার কারের নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়। তবে কোনও বগি উল্টে যায়নি। প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে বগি ও ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীরা পড়ে আহত হন। খবর পেয়ে বগুড়ার আদমদীঘি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।
সান্তাহার জংশন স্টেশনের ওয়েম্যান সোহেল বলেন, ‘বুধবার সকাল থেকে ভাঙা রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল। আমরা লাল ব্যানার লাগিয়ে কাজ করছিলাম। ট্রেনের চালক সংকেত অমান্য করে ট্রেনে চালিয়ে যাওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।’
চালকের ভুল
দিনাজপুরের হিলির ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী ভবেশ চন্দ্র বলেন, ‘বুধবার সকাল থেকে ঘটনাস্থলে ভেঙে যাওয়া রেললাইনের কাজ চলছিল। সান্তাহার জংশনের স্টেশন মাস্টার এ ব্যাপারে ঢাকা ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী ট্রেনের চালককে গতি নিয়ন্ত্রণের বার্তা দেন। এ ছাড়া ওয়েম্যান ও অন্যরা লাল ব্যানার লাগিয়ে কাজ করছিলেন। কিন্তু চালক এসব তোয়াক্কা না করে ট্রেন চালিয়ে যাওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।’
আদমদীঘি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ইনচার্জ রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চারটি ইউনিট কাজ করে আহত ৪৮ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। তাদের আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে প্রাণহানির কোনও ঘটনা ঘটেনি।’