ভাইকে দেখে কাঁদতে শুরু করেন সেই বৃদ্ধ, ভারতে গেলেন কীভাবে

জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর সীমান্তে শূন্যরেখায় আটকে থাকা সেই বৃদ্ধকে অবশেষে তাদের স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকাল ৫টার দিকে বকশীগঞ্জ থানা থেকে তাকে স্বজনদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে পুলিশ।

বিজিবি ও বকশীগঞ্জ থানা পুলিশ জানায়, কামালপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইনের শিকার বৃদ্ধের পরিচয় মিলেছে। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। নাম তার ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন। বয়স ৬৮ বছর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃদ্ধের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। তারা বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রায় ২৪ ঘণ্টা শূন্যরেখায় অবস্থানের পর পরিচয় নিশ্চিত হয়ে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সীমান্তের ১০৮২ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলারের সামনে থেকে তাকে উদ্ধার করে বিজিবি। এরপর তাকে বকশীগঞ্জ থানায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে পরিবাবের কাছে তাকে হস্তান্তর করেন।

ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চন্দলাই গ্রামে। পরিবারের দাবি, তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। প্রায় দুই মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। তবে তিনি কীভাবে ভারতে গেলেন সেটি নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি স্বজনরা।

স্বজনরা জানিয়েছেন, গোদাগাড়ী উপজেলার চন্দলাই (ললিতনগর) গ্রামের হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা ষষ্ঠী চন্দ্র পেশায় মৎস্যজীবী ও কৃষক ছিলেন। এক ছেলে ও তিন মেয়ের বাবা। সব সন্তানের বিয়ে হয়েছে। তিনি মাছ ধরা ও কৃষিকাজ করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। এক বছরের বেশি সময় ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি।

ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনের ভাতিজা গোপাল চন্দ্র বর্মন জানান, দারিদ্র্য ও পারিবারিক অশান্তির কারণে ষষ্ঠী বর্মন বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ভবঘুরে হয়ে পড়েন। তার স্ত্রী ও তিন মেয়ে ভাঙাচোরা বাড়িতেই থাকেন। একমাত্র ছেলে বিয়ের পর আলাদা হয়ে গেছে। 

বিকাল ৫টার দিকে বকশীগঞ্জ থানা থেকে তাকে স্বজনদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে পুলিশ

গোপাল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘প্রায় দুই মাস আগে বাড়ি থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হন আমার চাচা। কয়েক দিন পর ফেসবুকের মাধ্যমে কুড়িগ্রামে সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তবে তখন চাচার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। কারণ তার সঙ্গে মোবাইল নেই। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ ছিল না। এমনকি পরিবারের সদস্যরাও খোঁজ-খবর রাখতেন না। কীভাবে তিনি ভারতে গেলেন কিংবা জামালপুর সীমান্তে পৌঁছালেন, সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী বাশার আলী জানান, নিখোঁজের পর থেকে পরিবার তার সন্ধান চালিয়ে আসছিল। অবশেষে খোঁজ পাওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য তার ভাই ভবানী বর্মন রওনা দেন।

ষষ্ঠী বর্মনকে গ্রহণ করতে বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহী থেকে তার বড় ভাই ভবানী বর্মন ও মেয়ের জামাই রোদ চন্দ্র বর্মন বকশীগঞ্জ থানায় যান। এ সময় ভাইকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ষষ্ঠী বর্মন। পরে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিকাল ৫টার দিকে পরিবাবের কাছে হস্তান্তর করেন তাকে। বিকাল সোয়া ৫টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে ষষ্ঠী বর্মনকে নিয়ে জামালপুর থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে আসেন তারা।

বড় ভাই ভবানী বর্মন বলেন, ‘আমার ছোট ভাই দুই মাস আগে হঠাৎ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিল। আমরা গরিব মানুষ। টাকা-পয়সা নেই, তাই পুলিশের কাছে যাইনি। বুধবার রাতে আমার ছেলে একটা ভিডিও দেখে বলে, কাকাকে জামালপুর সীমান্তে দেখা গেছে। পরে আমরা বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করি। এখানে এসে ভাইকে ফিরে পেলাম। আমাকে দেখে কাঁদতে শুরু করে ভাই। বিএসএফ তাকে কীভাবে তাদের দেশে পেয়েছে, সেটিও আমার জানা নেই। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় তার কথাবার্তা এলোমেলো। পরে আমরা তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইবো। আপাতত তাকে নিয়ে আমরা বাড়ি যাচ্ছি।’

বুধবার সকালে কামালপুর সীমান্তের ১০৮২ নম্বর পিলার এলাকা দিয়ে ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনকে বাংলাদেশে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টা করেন বিএসএফ সদস্যরা। বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি সদস্যরাও সেখানে অবস্থান নেন। এ সময় বিএসএফ ও বিজিবি সদস্যদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজিবির সঙ্গে যোগ দেন।

একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা ওই বৃদ্ধকে সীমান্তের শূন্যরেখায় রেখে চলে যান। বিএসএফ ও বিজিবি সদস্যদের বাগবিতণ্ডার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে পরিচয় যাচাই-বাছাই করে তাকে সীমান্ত এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। শূন্যরেখা থেকে উদ্ধার করে তাকে থানা হেফাজতে পাঠানো হয়।

বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মকবুল হোসেন বলেন, ‘ওই বৃদ্ধকে থানায় আনার পর পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

প্রায় ২৪ ঘণ্টা শূন্যরেখায় অবস্থানের পর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়

জামালপুর ৩৫ বিজিবির সহকারী পরিচালক ইমাম হোসেন জানিয়েছেন, ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বাসিন্দা। তার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে পরিচয়। এরপর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

যেভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে পরিচয়

বিজিবির সহকারী পরিচালক ইমাম হোসেন জানান, বুধবার তার পরিচয় ও বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে ঠিকভাবে বলতে পারেননি। তখন শুধু বলেছিলেন তার বাড়ি রাজশাহী। পুরোপুরি ঠিকানা বলতে পারছিলেন না। তার কাছে কোনও আইডি কার্ড ছিল না। এজন্য তাকে তখন রিসিভ করা যায়নি। বুধবার বিজিবি ও বিএসএফের একটি ভিডিওটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিও দেখে রাতেই পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত এবং বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে পরিচয় শনাক্ত করেন।