বগুড়ায় খাল খননের শ্রমিকের তালিকায় চেয়ারম্যান-মেম্বার-শিক্ষক-প্রবাসী

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নে একটি খাল পুনর্খনন কর্মসূচিতে শ্রমিকের তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে নেওয়া এ প্রকল্পে শ্রমিক তালিকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, শিক্ষক, প্রবাসী, চাকরিজীবী ও সচ্ছলদের নাম রয়েছে। 

তালিকা ২৯৭ জনের হলেও মাঠে সামান্য কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির এ প্রকল্পে অনিয়মের ঘটনায় জনগণের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার বিকালে গাবতলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মজিদুল ইসলাম শ্রমিক তালিকায় অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা স্বীকারও করেছেন। তিনি বলেছেন, অভিযোগ আসার পর খাল খননের কাজের ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ওই তালিকা সংশোধন করা হয়েছে। আরও যাচাই চলছে।

গাবতলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের ‘খুপি হাড়িভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছ থেকে আটবাড়িয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প পর্যন্ত খাল পুনঃখনন’ কাজ হাতে নেওয়া হয়। বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিলটন গত ৫ মে নামফলক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এই খাল খননের কাজে শ্রমিকের তালিকায় ২৯৭ জনের নাম পাওয়া যায়। 

সম্প্রতি খুপি হাড়িভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, খাল খননে খননকারী মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। আর কয়েকজন শ্রমিক কোদাল দিয়ে খালের পাড় বাঁধার কাজ করছেন।

শ্রমিকরা জানান, কর্মসূচির উদ্বোধনের দিন প্রায় ১৫০ জন শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন। পরদিন থেকে শ্রমিকের সংখ্যা কমে যায়। শ্রমিক তালিকায় ২৯৭ জনের নাম থাকলেও বাস্তবে কাজ করেন ৫০ থেকে ৬০ জন। শ্রমিকের ওই তালিকা নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। 

তালিকায় দেখা যায়, গাবতলী উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের জামিরবাড়িয়া গ্রামের মামুনের নাম আছে। অথচ তিনি মালয়েশিয়াপ্রবাসী। তালিকায় দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরটি তার ছোট ভাই সুমনের। তালিকায় থাকা জামিরবাড়িয়া গ্রামের রুহুল আমিন আকন্দ ও স্কুল শিক্ষক রবিউল ইসলাম আকন্দ সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার (সদস্য) হজরত আকন্দের ছেলে। শ্রমিকের তালিকায় মেম্বার হজরত আকন্দেরও নাম আছে। তালিকায় শ্রমিক হিসেবে থাকা কবির হোসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এছাড়া শ্রমিক তালিকায় সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাজা মন্ডলের নাম পাওয়া গেছে।

ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হজরত আলীর ছেলে স্কুলশিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, এই খাল খনন প্রকল্পে দুজন ভিআইপি শ্রমিক রয়েছেন। এর মধ্যে তিনি একজন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সোনারায় ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাজা মন্ডল জানান, ২৯৭ জনের তালিকায় শ্রমিক ঘাটতি ছিল। অফিস থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্রমিক তালিকা চাওয়া হয়েছিল। সে কারণে পরিষদের হিসাব সহকারী তার (রাজা মন্ডল), মেম্বার, প্রবাসী ও স্কুল শিক্ষকের নাম দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ওই তালিকা সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে তার নাম বাদ দিয়ে ছোট ভাই রাজু মণ্ডলের নাম দেওয়া হয়েছে। 

তিনি আরও জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে বর্তমানে খাল খনন প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে।

মঙ্গলবার বিকালে গাবতলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মজিদুল ইসলাম খাল খনন প্রকল্পে শ্রমিক তালিকায় চেয়ারম্যান, মেম্বার, তাদের ছেলে, প্রবাসী ও স্কুলশিক্ষকের নাম থাকার সত্যতা বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেন। তবে তিনি বলেন, অনেক আগের ওই শ্রমিক তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পরবর্তী সময়ে সংশোধন করা হয়েছে। গত ২০ জুন থেকে পুনরায় খনন কাজ শুরু করা হয়। অর্থবছর শেষ হওয়ায় বর্তমানে কাজটি বন্ধ রয়েছে। পরে আবার শুরু করা হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাবতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খাল খননে শ্রমিক তালিকায় এমন অনিয়ম হওয়ার কথা ছিল না। তালিকা এখনও হাতে পাইনি; বিলও পরিশোধ করা হয়নি। অনিয়ম ধরা পড়লে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।