বাড়ছে পদ্মার পানি, রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধকে নিরাপদ রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা 

উজানের ঢল ও নদী অববাহিকায় পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির কারণে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা বেড়েছে ২ দশমিক ০৪ মিটার। যদিও পানি এখনও বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তবুও সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধ’ ঝুঁকিমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি বাঁধের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন ও পাউবো। 

১৪ দিনে ২.০৪ মিটার পানি বৃদ্ধি, তবে নেই বন্যার আশঙ্কা

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, চলতি মাসের ১ জুলাই পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ৯ দশমিক ৭৮ মিটার। ১৫ জুলাই বুধবার দুপুরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৮২ মিটারে। জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে পানি বাড়তে শুরু করার পর মাঝে ৭ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত পানির স্তর কিছুটা কমলেও, ১০ জুলাই থেকে তা আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়।

পাউবোর শহর রক্ষা শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু হুরায়রা জানান, রাজশাহীতে পদ্মা নদীর বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। সর্বশেষ পরিমাপ অনুযায়ী পানি এখনও বিপৎসীমার প্রায় ৬ দশমিক ৯৭ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্যার কোনও আশঙ্কা নেই। পাউবোর পানি গেজ রিডার এনামুল হক প্রতিদিন পানির উচ্চতা পরিমাপ করে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখছেন। 

চরাঞ্চলে পানির থৈথৈ ভাব, ভেসে আসছে কচুরিপানা 

সরেজমিনে পদ্মার পাড় ও চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, নদী অববাহিকায় পানি বাড়ায় মাঝ নদীর ছোট ছোট চরগুলো আংশিকভাবে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। নদীর তীব্র স্রোতের সঙ্গে প্রচুর কচুরিপানা ভেসে আসছে, যা স্থানীয়দের মতে উজানের ভারী ঢলের স্পষ্ট ইঙ্গিত। 

পদ্মার পাটুলিঘাট এলাকার নৌকার মাঝি জিয়াউর রহমান জানান, আষাঢ়ের শেষ থেকে শ্রাবণ মাসজুড়ে পানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা স্বাভাবিক। চর খিদিরপুরের বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন এবং চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের সাইফুল ইসলাম জানান, চরের নিচু এলাকা তলিয়ে গেলেও মূল বসতি এখনো নিরাপদ রয়েছে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে চরাঞ্চলের মানুষ আগেভাগেই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

পাউবোর পানি গেজ রিডার এনামুল হক জানান, প্রতিদিন পানির উচ্চতা পরিমাপ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পানি আরও বৃদ্ধি পেলে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

শহর রক্ষা বাঁধ সুরক্ষায় উচ্ছেদ অভিযান 

সম্ভাব্য বন্যা বা পানির চাপ মোকাবিলায় শহর রক্ষা বাঁধকে নিরাপদ রাখতে এর ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও পাউবোর যৌথ উদ্যোগে ইতিমধ্যে নগরীর কেশবপুর দক্ষিণপাড়া টি-বাঁধ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিজিৎ সরকারের নেতৃত্বে এই অভিযানে বাঁধের ওপর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থায়ী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিজিৎ সরকার জানান, দখলদারদের আগে একাধিকবার নোটিশ ও মাইকিং করার পরও যারা স্বেচ্ছায় সরে যাননি, মূলত তাদের বিরুদ্ধেই এই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শ্রীরামপুর বাঁধের পুরো অংশজুড়ে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। 

পাউবোর প্রস্তুতি ও বক্তব্য

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, “রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা। সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাঁধটি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও কার্যকর অবস্থায় রয়েছে। তবে বাঁধের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলো নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি। তাই পর্যায়ক্রমে পুরো জেলার চিহ্নিত এলাকাগুলোতে এই যৌথ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।” 

তিনি আরও জানান, বর্ষা মৌসুমে উজানের বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে পদ্মার পানি আরও কিছুদিন বাড়তে পারে। তবে আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। বাঁধের কোথাও কোনও দুর্বলতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সংস্কার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।