রাজশাহী বোর্ডের ৫ স্কুলে শতভাগ ফেল, কারণ কী?

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কোথাও আনন্দ, কোথাও স্বস্তি। তবে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পাঁচটি বিদ্যালয়ে এবার নেমে এসেছে হতাশা। এসব বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪১ জন শিক্ষার্থীর একজনও পাস করতে পারেনি।

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শূন্য পাসের হার পাওয়া পাঁচ বিদ্যালয়ের তিনটি রাজশাহীর, একটি নওগাঁর এবং একটি জয়পুরহাটের। সোমবার (১০ আগস্ট) এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় এ তথ্য জানান বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফরাত জেরিন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক করা হবে।

শূন্য পাসের হার পাওয়া বিদ্যালয়গুলো হলো—রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পাকড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বাঘা উপজেলার বানিয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও মোহনপুর উপজেলার আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়; নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার পাইলানপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার শিরট্টি ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয়।

পাকড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ছয়জন, বানিয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ছয়জন, আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৩ জন, পাইলানপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে নয়জন এবং শিরট্টি ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চারজন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছে।

তবে পাঁচ বিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়। ১৩ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করায় বিদ্যালয়টির পাঠদান, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষকসহ ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত। অথচ এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৩ শিক্ষার্থীর একজনও পাস করতে পারেনি। যদিও গত বছর বিদ্যালয়টি থেকে ২৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ২৩ জনই পাস করেছিল।

ফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। কয়েকজনের অভিযোগ, প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে নিয়মিত ক্লাস হয় না এবং শিক্ষকদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় যুবক আরিফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে এলেও অনেক সময় পাঠদানের পরিবর্তে পাশের বাজারে সময় কাটান।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা আনজুমান আরা মনে করেন, শুধু বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। তার মতে, বিদ্যালয়টির অনেক শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং তাদের পড়াশোনার বিষয়ে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত নজরদারি নেই।

এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর রহমান মঞ্জু বলেন, ফলাফল এমন হবে তা তারা ভাবেননি। তিনি বলেন, “বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আমি সব শিক্ষককে নিয়ে জরুরি সভা করব। কেন এমন ফল হলো, তা পর্যালোচনা করে কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।”

তিনি জানান, গত বছর ২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৩ জন পাস করেছিল। এবার এমন ফল কেন হলো, তা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে পর্যালোচনা করা হবে।

আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের কথাও সামনে এসেছে। স্থানীয় কয়েকজন প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মোহনপুর উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার আব্দুল মতিন বলেন, প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগের বিষয়টি তারা জানতেন। তার দাবি, আগের সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এখন থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হবে।

তার এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগের বিষয়টি শিক্ষা অফিসের জানা থাকলে এতদিন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন। একইভাবে নিয়মিত তদারকি হয়ে থাকলে বিদ্যালয়টির একাডেমিক দুর্বলতা আগে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি কেন—সেই প্রশ্নও উঠেছে।

ফল বিপর্যয়ের বিষয়ে মোহনপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম মাহমুদল হাসান বলেন, বিদ্যালয়টির এমপিও বাতিলের জন্য তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।

মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, ফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে প্রধান শিক্ষককে তলব করা হয়েছে। শিক্ষকদের পাঠদানে অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

তবে শতভাগ ফেল করার পর এমপিও বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলে শিক্ষা অফিসের নিয়মিত তদারকিতে তা আগে ধরা পড়ল না কেন।

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বোর্ডের কোনো বিদ্যালয়ের পাসের হার শূন্য ছিল না। এক বছরের ব্যবধানে এবার পাঁচটি বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ১৪ জন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ১৩ পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি নতুন করে নজর কেড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু শিক্ষার্থীদের ফল নয়—বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষকদের উপস্থিতি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তা এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসের মনিটরিং ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনও বিদ্যালয়ের শতভাগ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়া গুরুতর একাডেমিক সংকেত। এমন ফলের পেছনে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দুর্বলতা থাকতে পারে, আবার বিদ্যালয়ের পাঠদান ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও থাকতে পারে। তাই প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের ভূমিকা সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।

চলতি বছর মোহনপুর উপজেলায় পাঁচটি কেন্দ্রে এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় মোট ২ হাজার ৪২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে মোহনপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আটটি প্রতিষ্ঠানের ৪০৪ জন, মোহনপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নয়টি প্রতিষ্ঠানের ৩৬৭ জন, কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের ৫১৯ জন, কেশরহাট কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ৩২৭ জন এবং সাঁকোয়া-বাকশৈল কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের ৪২৫ জন পরীক্ষার্থী ছিল।

পাঁচ বিদ্যালয়ের ৪১ জন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস না করার ঘটনা এখন শুধু ফলাফলের পরিসংখ্যান নয়; সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।