ভাঙা সাইকেল আর দিনমজুরির পথ পেরিয়ে ফারিহা আজ ‘দেশসেরা ফুটবলার’  

কখনও কাদা-পানিতে ধান রোপণ, আবার কখনও পচা পানিতে নেমে পাট ধোয়ার কঠোর দিনমজুরি— জীবিকার তাগিদে এই কিশোরী হাতের কাজ শেষে দিনশেষে ভাঙা সাইকেলটি টেনে বের করতেন। প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতেন ফুটবল মাঠে। অভাব, পারিবারিক প্রতিবন্ধিতা এবং সমাজের গঞ্জনাকে জয় করে নাটোরের সেই অদম্য কিশোরী জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা মনি আজ অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবলের ‘দেশসেরা খেলোয়াড়’। 

ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এর জাতীয় পর্যায়ের অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবলের ফাইনালে রাজশাহী বিভাগের হয়ে মাঠে নেমে ফারিহার অসাধারণ পারফরম্যান্স মুগ্ধ করেছে ফুটবল বোদ্ধাদের। ৫ গোল করে সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফিটি তিনি বুঝে নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে।

পায়ের জাদুতে ৫ গোল, টুর্নামেন্ট সেরা 

নাটোরের লালপুর উপজেলার নান্দরায়পুর গ্রামের প্রতিবন্ধী মুকুল মণ্ডলের মেয়ে ফারিহা। স্থানীয় নান্দরায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির এই ছাত্রী মাঠে খেলেন ফরোয়ার্ড পজিশনে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর এই আসরে রাজশাহী অঞ্চলকে ফাইনালে তুলতে তার ভূমিকা ছিল মূল চালিকাশক্তি।

বরিশাল অঞ্চলকে ৫-০ এবং খুলনাকে ২-০ গোলে পরাজিত করার ম্যাচ দুটিতে একা হাতেই ৫টি গোল করেন ফারিহা। যদিও ফাইনালে রংপুর বিভাগের কাছে রাজশাহী বিভাগ হেরে যায়, তবে পুরো আসরে দুর্দান্ত নৈপূণ্যের স্বাক্ষর রেখে টুর্নামেন্ট সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।

পাট ধোয়া থেকে ভাঙা সাইকেলের পথচলা

ফারিহার এই পথচলা কোনও রূপকথার মতো সহজ ছিল না। বাবা প্রতিবন্ধী হওয়ায় চার সদস্যের টানাপোড়েনের সংসারের দায়িত্ব পড়ে মা আজেলা বেগমের ওপর, যিনি সড়কে মাটি কাটার কাজ করেন। মায়ের একার আয়ে সংসার না চলায় লেখাপড়া ও ফুটবলের খরচ মেটাতে দিনমজুরি শুরু করতে হয় ফারিহাকেও।

ফারিহা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, লেখাপড়া আর ফুটবলের খরচ জোগাতে তাকে দিনমজুরের কাজ করতে হয়। প্রতিদিন বিকালে পুরনো ভাঙা সাইকেল চালিয়ে ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নর্থবেঙ্গল চিনিকলের পাশের ‘নর্থবেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে’ অনুশীলনে যেতেন তিনি। ফুটবলের তীব্র অনুরাগের কারণে শারীরিক ক্লান্তি ও দারিদ্র্য তাকে কখনও থামাতে পারেনি। 

কটূক্তি বনাম মায়ের স্বপ্ন 

ফারিহার মা আজেলা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মেয়ে ফুটবল খেলায় প্রতিবেশীরা নানা ধরনের কটূকথা বলতো। বলতো— ‘মেয়ে হয়ে কেন হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলবে, বিয়ে করে সংসার ধর্ম সামলাবে!’ এসব কথা খুব কষ্ট দিতো। কিন্তু আজ ফারিহার সাফল্য আমার সব ব্যথা দূর করে দিয়েছে। মেয়েকে নিয়ে আমার স্বপ্ন এখন অনেক উঁচুতে।” 

ফারিহা জানান, প্রতিকূল এই সময়ে মা-বাবার সমর্থনের পাশাপাশি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কোচ জুয়েল রানা। তিনিই তাকে বুট, প্যাড, পোশাক এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে খেলায় টিকিয়ে রেখেছেন। 

প্রিয় তারকা ঋতুপর্ণা, লক্ষ্য জাতীয় দল 

জাতীয় দলের তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা ফারিহার প্রিয় খেলোয়াড়। তাই প্রিয় তারকার পছন্দের ১৭ নম্বর জার্সি গায়ে দিয়েই মাঠে নামেন তিনি। স্বপ্ন এখন লাল-সবুজের মূল জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বমঞ্চে ফুটবল খেলা। 

কোচ জুয়েল রানা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “গ্রামের মেঠো পথ ও ভাঙা সাইকেলে শুরু হওয়া ফারিহার এই যাত্রা একদিন আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছাবে। সে দেশের জন্য অনেক বড় গৌরব বয়ে আনবে।”