রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে ওহিদুল মোল্লার (৩২) কর্মজীবন শুরু। জীবিকার তাগিদে পরে রিকশা চালানো শুরু করেন। তবে এই পেশায় বেশি দিন স্থায়ী হননি তিনি। পাঁচ বছর আগে রিকশা চালানো বাদ দিয়ে শুরু করেন হ্যাকিং কার্যক্রম। সঙ্গে যুক্ত করেন মাদকের ব্যবসাও। হ্যাকিং জগতে যোগ দেওয়ার পর দ্রুত বাড়তে থাকে ওহিদুলের সম্পদ।
এখন বিস্তৃত হ্যাকিং জগতের মালিক হয়ে উঠেছেন ওহিদুল মোল্লা। এলাকায় তিনি ‘হ্যাকিং গুরু’ নামে পরিচিত। তার সেই হ্যাকিং ও মাদকের জগতে যুক্ত রয়েছেন বহু তরুণ। রয়েছেন পুলিশ সদস্যও। ওহিদুল মোল্লা নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের মৃত রাব্বেল মোল্লার ছেলে।
হ্যাকিং জগতে ওহিদুলের উত্থান
হ্যাকিং চক্রের সঙ্গে কাজ শুরুর পর থেকে বদলে যায় ওহিদুলের চলাফেরা ও আচার-আচরণ। হাতখরচ বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে। অল্প দিনের ব্যবধানে বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়া ওহিদুলের উত্থান এলাকার মানুষকে বিস্মিত করে তোলে।
ওহিদুলের হ্যাকিং জগতের গল্প শোনাচ্ছিলেন তারই আপন চাচাতো ভাই সেন্টু মোল্লা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর লেখাপড়া করার সুযোগ হয়নি ওহিদুলের। গ্রামের মাদ্রাসায় লেখাপড়া বাদ দিয়ে দিনমজুরি, এরপর রিকশা চালানো শুরু করেন। সব ছাপিয়ে হঠাৎ করেই বদলে যেতে থাকে ওহিদুলের জীবনযাত্রা। হুহু করে বাড়তে থাকে অর্থ-সম্পদও। নির্বিঘ্নে হ্যাকিং কার্যক্রম চালাতে গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে বাড়ি পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরাও স্থাপন করেন। মহিষ ও কবুতরের খামারের আড়ালে গড়ে তোলেন মাদকের ব্যবসা।
সেন্টু মোল্লার ভাষ্য, পাঁচ বছর আগে হঠাৎ করে রিকশা চালানো বাদ দেন ওহিদুল। তখন থেকে স্থানীয় হ্যাকারদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। যোগ দেন হ্যাকার চক্রের সঙ্গে। অল্প সময়ের মধ্যে ওহিদুল হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ হ্যাকার। হ্যাকারদের মধ্যে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ওহিদুল নিজেই হয়ে ওঠেন হ্যাকার গুরু। তার তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে সক্রিয় একটি বড় হ্যাকার চক্র।
হ্যাকিং ও মাদক বিক্রির টাকায় মোহরকয়া গ্রামে পৈতৃক বাড়ি করার পর বিলমাড়িয়ায় পদ্মা নদীর তীরে আরও একটি পাকা বাড়ি করেছেন। রয়েছে মহিষ ও কবুতরের বড় দুটি খামার। এসব খামারে রয়েছে লাখ লাখ টাকা মূল্যের মহিষ ও কবুতর।
স্থানীয়দের আলোচনায় ‘হ্যাকিং গুরু’
হ্যাকিংয়ের কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে সবসময়ই গ্রামের মানুষের আলোচনায় ছিলেন ‘হ্যাকিং গুরু’ ওহিদুল। স্থানীয়দের দাবি, ওহিদুলের বাড়ি ইটের উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত। বাইরে থেকে বাড়ির ভেতরের কোনো কিছুই আন্দাজ করা যায় না। বাড়িতে প্রবেশের জন্য ফটকও রয়েছে একটাই। তবে বাড়িটিতে স্থানীয় লোকজনের যাতায়াত না থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত তরুণদের আনাগোনা দেখা যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে লালপুরে ভাড়ায় চালিত একটি প্রাইভেট কারের চালক বলেন, অল্প সময়ে বেশ টাকা-পয়সার মালিক হয়েছেন ওহিদুল। দামি গাড়ি ভাড়া করে চলাচল করতেন। তার প্রাইভেটকার নিয়ে রাজশাহী ও পাবনায় বেড়াতে যেতেন ওহিদুল। কখনও কখনও গাড়িতে করে রাতভর ঘোরাঘুরি করতেন। কোনো জিনিসপত্র কিনলে দরদাম করতেন না। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে কর্মচারীদেরও হাজার হাজার টাকা বকশিশ দিতেন। প্রাইভেট কারের ভাড়ার বাইরে তাদেরও ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বকশিশ দিতেন। এসব ছিল ওহিদুলের নিত্যদিনের কর্মকাণ্ড।
২০ ক্যামেরায় নজরদারি, কবুতরের ঘরে বসে ৬৮ সিমে হ্যাকিং
ওহিদুলের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা হ্যাকিং চক্রগুলোকে নজরদারি করা হতো কবুতরের খামারের ভেতরের একটি ঘর থেকে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ওই ঘরটিতে ছিল স্মার্ট মনিটর, ওয়াইফাই ব্যবস্থা ও সবার জন্য খাট। গ্রেফতার এড়াতে সেখানে বসেই চলত হ্যাকিং কার্যক্রম। পুলিশের ওপর নজরদারি করতে গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে ওই ঘর পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। হ্যাকিংয়ের জন্য সাতটি মোবাইল ফোনে অদলবদল করে ব্যবহার করা হতো ৬৮টি সিম।
পুলিশ জানিয়েছে, হ্যাকিং কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসা নির্বিঘ্নে করতে নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন ওহিদুল। প্রাচীরঘেরা পাকা বাড়ির একটি কক্ষে কয়েক শ কবুতর রাখার খামার বানিয়েছেন। সেই ঘরের মধ্যে এক পাশে একটি খাটে তিনি ঘুমান। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই সেখানে মানুষের বসবাস রয়েছে। আরাম-আয়েশের জন্য সেই ঘরে রয়েছে দামি আসবাব, সিসিটিভি মনিটর ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। এখানে বসেই তিনি হ্যাকিং করে অন্যের মোবাইলফোনের নিয়ন্ত্রণ নিতেন। যাতায়াতের জন্য দামি মোটরসাইকেলও ব্যবহার করতেন।
শুধু তাই নয়, হ্যাকিংয়ের জন্য বিভিন্ন অপারেটরের ব্যবহৃত ৬৮টি সিম কার্ডের নম্বর সাদা কাগজে ছকের মধ্যে লেখা ছিল। বিকাশ, নগদ, রকেট অ্যাকাউন্টের হিসাব রাখতে সিমগুলোতে সাংকেতিক চিহ্নও ব্যবহার করা হতো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওহিদুলের প্রতিবেশীরা বলেন, বাড়ির আশপাশে এত সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো দেখে তারা বিস্মিত হয়েছিলেন। জিজ্ঞাসা করলে ওহিদুল বলতেন, কবুতর ও মহিষচোর ঠেকাতে ক্যামেরা লাগিয়েছেন। অথচ পরে জানা গেল, এলাকায় পুলিশ এলে তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতেই ওই সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হতো। কবুতরের ঘরে বসে চালানো হতো হ্যাকিং কার্যক্রম ও মাদকের ব্যবসা।
কবুতরের ঘর থেকে গ্রেফতারের পর কারাগারে ওহিদুল
গ্রেফতারের রাতে ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরদারির পরও হ্যাকিং গুরু ওহিদুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয়েছে এক পুলিশ কনস্টেবলসহ তার আরও ছয় সহযোগীকে। সোমবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে সেই কবুতরের ঘর থেকেই ওহিদুল ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করা হয়।
লালপুর সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার দিবাগত রাতে লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়ার মোহরকয়া গ্রামে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনার সময় হাতেনাতে ওহিদুল মোল্লাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় আলামিন (২৩) নামের এক পুলিশ কনস্টেবলসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ সদস্য আলামিন রাজশাহী রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) কনস্টেবল। তিনি লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের পানসিপাড়া গ্রামের আতাহার প্রামাণিকের ছেলে। তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আরআরএফ রাজশাহীর কমান্ড্যান্ট (অতিরিক্ত ডিআইজি) দীন মোহাম্মদ।
গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ১০৬টি ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় হ্যাকিং কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসার অভিযোগে দুটি পৃথক মামলা হয়েছে।
ওই মামলায় ওহিদুল মোল্লাসহ ছয় আসামিকে রাতে আদালতে হাজির করা হলে লালপুর আমলি আদালতের বিচারক সাদ্দাম হোসেন তাদের সবাইকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রাত ৯টার দিকে তাঁদের নাটোর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ওহিদুলের কাছ থেকে আশপাশের অনেক মানুষ হ্যাকিং শিখে এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। তাছাড়া গ্রেফতার এড়াতে ওহিদুল নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করলেও পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পাননি। তিনি বলেন, অপরাধীরা লুকিয়ে থাকার কৌশল অবলম্বন করেও ছাড় পাবে না।