ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব ৫০০ পরিবার, সরকারি সহায়তা পাননি অনেকেই

নদীভাঙনে একের পর এক বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের ধিতপুর কুরশি ও আশপাশের গ্রামের মানুষজন। দুই বছর আগে ভাঙনে পুরো বারপাখিয়া গ্রামটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এরপর ভাঙন শুরু হয়েছে ধিতপুর ও কুরশী গ্রামে। এসব গ্রামের শত শত বসতঘর, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কবরস্থানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের অভিযোগ, তারা অনেকেই সরকারি বা কোনও সংস্থার কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা পাননি।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বারপাখিয়া গ্রামে ভোটার ছিলেন প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন। গ্রামটিতে তিন শতাধিক বসতভিটা, চারটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা ও দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। নদীভাঙনে পুরো গ্রামটি বিলীন হয়ে যাওয়ার পর ধিতপুর গ্রামের দিকে ভাঙন শুরু হয়।

ধিতপুর গ্রামে প্রায় ৫০০ বসতঘরের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৫০টি ভেঙে গেছে বলে স্থানীয় লোকজন জানান। ভাঙনে দুটি মসজিদ, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি কবরস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কুরশী-ধিতপুর গরুর হাট ও পল্লী বিদ্যুতের একটি অভিযোগ কেন্দ্রও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। অপরদিকে কুরশী গ্রামে প্রায় ৪০০ বসতঘরের মধ্যে দেড় শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

ধিতপুরে নিজের বসতভিটার সামনে দাঁড়িয়ে নদীভাঙন দেখছিলেন আব্দুর রহমান। তিনি সোমবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিনবার বাড়ি সরিয়েছি। এবার আবার ভাঙলো। চোখের পলকে আমার বসতভিটা ভেঙে যাচ্ছে। আমাদের আর যাওয়ার জায়গা নেই।’

একই গ্রামের ফরহাদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নদীগর্ভে আমাদের সব হারিয়ে গেছে। পুরো গ্রামটাই হারিয়ে যাচ্ছে। আর কয়েকটি বাড়ি আছে। এগুলোও ভেঙে গেলে ধিতপুর গ্রামটি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আমরা কোনও সরকারি সহযোগিতা পাইনি। কোনও সংস্থা বা সরকারি অফিসের লোকজনকে কখনো কাছে পাইনি।’

হতাশা ব্যক্ত করে বৃদ্ধ শহিদ আলী বলেন, ‘নয়বার ভাঙন দেখলাম। নয়বার নয় জায়গায় বাড়ি সরিয়েছি। শেষবারের সম্বলটুকুও ভেঙে গেলো এখন।’ ৮০ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুন বলেন, ‘আর কত ভাঙন দেখবো? বাড়ি সরাতে সরাতে নিজেই শেষ হয়ে গেলাম।’

ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের অভিযোগ, তারা সরকারি বা কোনও সংস্থার কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা পাননি

সরেজমিনে ধিতপুর গ্রামে গিয়ে একটি মসজিদ ভাঙনের মুখে পড়তে দেখা যায়। স্থানীয় লোকজন মসজিদের বিভিন্ন অংশ খুলে ভাঙন থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। টিন, বাঁশ ও খুঁটি দিয়ে মসজিদের মালামাল নিরাপদ স্থানে রাখার চেষ্টা করছিলেন তারা।

ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়া আমিনুল ইসলাম, ইসমাইল, ফরহাদ, ইউসুফ আলী বলেন, বছরের পর বছর নদীভাঙনে বাড়িঘর, জমি ও স্থাপনা হারালেও তাদের পুনর্বাসন বা স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি সরকারি ত্রাণ সামগ্রীও পাইনি কখনও। ভাঙনের পর তাৎক্ষণিক সহায়তাও তারা নিয়মিত পান না।
তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙনকবলিতদের ত্রাণ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ছাবিনা পারভিনের স্বামী সৈয়দ আলী মোল্লা বলেন, ধিতপুর ৮০/৯০ টি বাড়ি ভেঙেছে। আমার জানা মতে এই পাড়ার মানুষ কোনও ত্রাণ সহায়তা পায়নি এখনও। 

এ বিষয়ে জানতে সোনাতনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমানের মোবাইল নম্বরে কল দিলে তা বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, আমরা ১শ ৭৫ জনকে শুকনা খাবার দিয়েছি। পরবর্তীতে আবার লিষ্ট করে অন্যদের দেওয়া হবে।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিন শারমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি নিজে সেখানে ত্রাণ দিয়েছি।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে অফিসে এসে খোঁজ নিতে বলেন তিনি।