প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো রাজশাহী সফরে আসছেন তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে রাজশাহী ধর্মসভা মন্দির পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় শুভেচ্ছা জানাবেন তিনি। পরে নগরীর মাদ্রাসা মাঠে জনসভায় বক্তব্য দেবেন। সেখানে পদ্মা ব্যারাজ থেকে কর্মসংস্থান—নানা বিষয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতে চান রাজশাহী বিএনপির নেতারা। এমনটি জানিয়েছেন তারা।
দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি—রাজশাহীর উন্নয়ন ঘিরে দীর্ঘদিনের এসব প্রত্যাশা এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তুলে ধরতে চান। কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও রফতানির সুযোগ বাড়ানোর দাবিও দীর্ঘদিনের। শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট নিরসন এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর প্রত্যাশাও রয়েছে তাদের।
এসব দাবি ও নতুন আশার মধ্যে মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজশাহী সফরে আসছেন তারেক রহমান। রাজশাহী বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই সফর শুধু জনসভা ও আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান ও উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগের সূচনা করবে।
প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে প্রস্তুত রাজশাহী
প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে ইতোমধ্যে প্রস্তুত রাজশাহী। ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে জনসভার মঞ্চ নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও সড়ক সংস্কারের কাজ প্রায় শেষ। মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় এ মাঠের জনসভায় বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে দুপুর দেড়টায় নগরীর ঐতিহ্যবাহী ধর্মসভা মন্দির পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। তবে রাজনৈতিক আয়োজনের বাইরেও রাজশাহীবাসীর বড় প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে এবার কী ঘোষণা আসে?
কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে গুরুত্ব
রাজশাহীবাসীর প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে কর্মসংস্থান। শিক্ষক লুৎফর রহমান চান, রাজশাহীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে সরকার বিশেষ নজর দিক। বেসরকারি চাকরিজীবী জুবায়ের আহমেদের প্রত্যাশা, বেকারত্ব দূর করার পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও যৌক্তিক বেতনকাঠামো নিশ্চিত করা হোক।
গৃহবধূ আসমাউল হুসনার ভাষ্যমতে, শিক্ষানগরী হিসেবে রাজশাহীর পরিচিতি থাকলেও ভালো চাকরির সুযোগ সীমিত। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অনেক সময় যোগ্যতার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ পেশায় যুক্ত হতে হচ্ছে। বড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাও কম নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান মনে করেন, সরকারি হোস্টেল চালু হলে শিক্ষার্থীদের আবাসনব্যয় কমবে এবং নিরাপদ পরিবেশে থাকার সুযোগ বাড়বে।
ব্যবসায়ী আব্দুল আলিমের দাবি, রাজশাহী বিভাগকে এগিয়ে নিতে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা জরুরি। বিশেষ করে নারীদের নিজ এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে পরিবার ও সমাজ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তরুণদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠা। তাদের মতে, কৃষি, শিক্ষা ও শিল্পকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে রাজশাহীর অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।
কৃষি, রফতানি ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন
রাজশাহীর উন্নয়নের দাবিগুলো নিয়ে কথা বলেছেন জনপ্রতিনিধিরাও। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু জানিয়েছেন, কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ, আখচাষিদের সহায়তা এবং কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
রাজশাহী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করা, কার্গো বিমান চালু এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা গেলে আমসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
পাশাপাশি রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা, শিশু হাসপাতাল চালু, ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে বিরতিহীন ট্রেন চালু এবং কলকাতার সঙ্গে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, রাজশাহীর হারানো চিনি ও রেশমশিল্পের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নতুন বিনিয়োগ ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পদ্মা ব্যারাজ ও নগর উন্নয়নের প্রত্যাশা
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘নগরীর উন্নয়নে বিমান চত্বর থেকে কাশিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের সড়ক নির্মাণ, বিভিন্ন সড়ক প্রশস্তকরণ, ৩০টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ ও ফুটসাল গ্রাউন্ড উন্নয়ন এবং সিনিয়র সিটিজেন পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, গত ২৯ জানুয়ারির নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, কৃষিঋণ মওকুফ ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এসব প্রতিশ্রুতির অধিকাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর সুফল পৌঁছানোই হবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে বীজ সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা, কৃষিভিত্তিক ইপিজেড, পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা এবং নগরীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শিক্ষা নগরী’ ঘোষণার দাবি তুলে ধরা হবে।
অন্যদিকে রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ বলেছেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে কারখানাগুলো পুরোদমে চালুর আশাও প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে এ পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে কার্যকর সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ ও সুনির্দিষ্ট সময়সীমার ওপর।
জনসভা ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির। গোয়েন্দা নজরদারি, সাদাপোশাকে পুলিশ, স্ট্যাটিক ও স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের পথেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে জনসভাস্থল প্রস্তুত করতে ৫৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৫ ফুট প্রস্থের মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। মাঠ ও আশপাশে বসানো হয়েছে শতাধিক মাইক এবং চারটি এলইডি স্ক্রিন।
প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চান রাজশাহীবাসী
প্রধানমন্ত্রীর এ সফর রাজশাহীর মানুষের কাছে নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। তবে এসব প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত বিনিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা। পদ্মা ব্যারাজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন—প্রতিটি দাবিই এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। রাজশাহীবাসী চান, প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রত্যাশা শুনবেন এবং বাস্তবায়নযোগ্য দাবিগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন।
জনসভায় কী ঘোষণা আসে, তার চেয়েও বড় বিষয় হবে সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ এবং উন্নয়নের দৃশ্যমান পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন রাজশাহীর মানুষ।