‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’

ছয় বছরের মেয়ে আফিয়াকে বুকে জড়িয়ে বাসের সিটে ঘুমিয়ে ছিলেন মেহেরুন্নেছা জেবা (২২)। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। চোখ খুলে দেখেন, সামনের সিটের নিচে আটকে আছেন তিনি। পাশে পড়ে আছে চারজনের নিথর দেহ। বাসের ভেতর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ, চারদিকে রক্ত। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। সামনের দিক থেকে ভেসে আসছে মানুষের কান্না ও আর্তচিৎকার। ভয়াবহ সেই দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে যান তিনি।

মঙ্গলবার ভোর চারটার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষের পরের দৃশ্য ছিল এমনই। ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির যাত্রী মেহেরুন্নেছা ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও আহত হয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বনপাড়া হাইওয়ে থানায় বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে দুর্ঘটনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।

মেহেরুন্নেছা জেবা বলেন, বরিশাল থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মামাশ্বশুরের বাড়িতে যাচ্ছিলাম। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলেই দেখি, সিটের নিচে আটকে আছি, পাশে পড়ে আছে চারজনের লাশ। আমার ডান হাত থেকেও রক্ত ঝরছিল। তখনই বুঝতে পারি, আমাদের বাসটি দুর্ঘটনায় পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমার ছয় বছরের মেয়ে আফিয়া কাঁদছিল। বাসের ভেতরে ভাঙা কাচ ছড়িয়ে থাকায় বের হতে পারছিলাম না। এর মধ্যে আমার জুতা ও ব্যাগও হারিয়ে যায়। একপর্যায়ে হাত বাড়িয়ে পাশে পড়ে থাকা একটি মরদেহের স্যান্ডেল নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু পারছিলাম না। আমাদের চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন। তাদের সহায়তায় মই বেয়ে জানালা দিয়ে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাস থেকে বের হই। পরে তারা আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে আমার ডান হাতে সেলাই দেওয়া হয়। তবে ব্যাগে মোবাইল ফোন না থাকায় দুর্ঘটনার পরপরই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বনপাড়া হাইওয়ে থানায় যাই।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন জানান, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হারিয়ে যাওয়া ব্যাগটি উদ্ধার করে মেহেরুন্নেছার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি বরিশালের উদ্দেশে রওনা হন।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার ভোর চারটার দিকে বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার সরকারপাড়া এলাকায় যাত্রীবাহী আরপি পরিবহনের বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ১৪ জন নিহত হন এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে বাসটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।

নাটোরের এসপি শরীফুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে একজন সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন। দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে বনপাড়া হাইওয়ে থানায় নেওয়া হয়েছে। আহতদের নাটোর ও বড়াইগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত ১৪ জনের মধ্যে ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর সদর আসনের সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার এবং পুলিশ সুপার শরীফুল ইসলাম।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া দুর্ঘটনা রোধে বনপাড়া-পাবনা মহাসড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।