নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ

নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না আনোয়ারের

আনোয়ার হোসেনের (৩০) নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর কেটেছে মাত্র কয়েক দিন। মনে আনন্দ নিয়ে পরিবারের কাছে ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু মুহূর্তেই সেই আনন্দ চিরদিনের জন্য মুছে গেলো। নাটোরের বড়াইগ্রামের মহাসড়কে থেমে গেল আনোয়ারের জীবন।

আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর চারটার দিকে বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া এলাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তাদের বহনকারী বাসটি। দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ নিহত ১৪ জনের একজন আনোয়ার। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।

নিহত আনোয়ার হোসেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের চাঁইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। বনপাড়া হাইওয়ে থানায় সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় রাখা হয়েছে তার মরদেহ। লাশ নিতে সেখানে এসেছেন তার চাচা আকতার হোসেন।

থানায় বসে আকতার হোসেন বলেন, সকালে খবর পাওয়ার পরই ভাতিজার মরদেহ নিতে বড়াইগ্রামে এসেছেন তিনি। তবে এখনও মরদেহ বুঝে পাননি। মরদেহ নিতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হচ্ছে।

আকতার হোসেনের ভাষ্য, গ্রামের স্বজনেরা মরদেহের অপেক্ষায় আছেন। বাড়ির পাশের পারিবারিক কবরস্থানে আনোয়ারকে দাফন করা হবে। এরই মধ্যে কবর খোঁড়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে আনা হচ্ছে।

আজ সকালে চাঁইপাড়া গ্রামে আনোয়ারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী ফাতেমা বিবি দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ডুকরে কাঁদছেন। কান্নার একপর্যায়ে তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। ছেলের স্মৃতি মনে করে কাঁদছেন আনোয়ারের মাও। বাড়ির উঠানে ভিড় করেছেন আশপাশের লোকজন। প্রতিবেশীরা এসে স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

আনোয়ারের ভাতিজা মিজানুর রহমান জানান, অনেক আগে থেকেই ঢাকায় থাকতেন আনোয়ার। কিছুদিন আগে একটি প্রকল্পে নতুন চাকরি পান তিনি। নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়ে বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন। নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কের পুঠিয়া এলাকায় বাস থেকে নেমে বাড়ি পৌঁছানোর কথা ছিল তাঁর। এসব কথা মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন আনোয়ার।

আনোয়ারের চাচা আকতার হোসেন বলেন, ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে আনা হচ্ছে। কাফনও কেনা হয়েছে। বাড়ির পাশের কবরস্থানে কবর খোঁড়া হচ্ছে। মরদেহ নিয়ে ফিরলেই সেখানে ভাতিজাকে দাফন করা হবে।

বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনায় আনোয়ারের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তার পরিবারকে জানানো হয়েছে। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য থানা-পুলিশ বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

মঙ্গলবার ভোর চারটার দিকে বড়াইগ্রামের বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের অদূরে সরকারপাড়া এলাকায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ১৪ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হন।

বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম হোসেন বলেন, আরপি পরিবহনের বাসটি বরগুনা থেকে যাত্রী নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাচ্ছিল। অন্যদিকে ট্রাকটি পঞ্চগড় থেকে বালু নিয়ে ঝিনাইদহের দিকে যাচ্ছিল। পথে বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রামের সরকারপাড়া এলাকায় ভোর চারটার দিকে যানবাহন দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

এসআই শামীম হোসেনের ভাষ্য, দুর্ঘটনাস্থলে ১০ জনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে, তবে তার পরিচয় জানা যায়নি।

তিনি আরও বলেন, ট্রাকটি মহাসড়কের বাম পাশের লেন ধরে চলছিল। তবে বেপরোয়া গতিতে থাকা বাসটি অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। দুর্ঘটনায় দুই যানবাহনের চালকই মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে এক শিশু ছাড়াও একাধিক নারী ও বয়স্ক ব্যক্তি রয়েছেন।