একটা স্নাইপারের অভাব ছিল মন্তব্য: সেই যুবক ও তার পরিবার সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) বাসে চড়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যাতায়াতের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করার পর তাতে–‘ইস! একটা বড় সুযোগ ছিল, শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্যকারী যুবক মো. আবু বকর সিদ্দিককে আটক করা হয়েছে। একইসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার বাবা মো. আয়নাল হককেও আটক করা হয়। পরে দুজনকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে রাজশাহীর পবা থানার পারিলা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-৫। পরে তাদের ঢাকায় নেওয়া হয়। তারা বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজতে আছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে এসআরবি-৫-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল ফয়সাল ইশতিয়াক বলেন, ‘আটকের পর তাদের দুজনকেই ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছি আমরা। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবে ডিবি।’

আবু বকর ও তার পরিবার সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

আটক আবু বকরের বাড়ি রাজশাহী নগরীর চন্দ্রিমা থানার কেচুয়াতৈল এলাকায়। তার বাবা আয়নাল হক পেশায় কৃষক। তার চার ছেলেমেয়ে। একমাত্র ছেলে আবু বকরই সবার বড়। তিনি রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র বলে জানা গেছে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পড়াশোনার পাশাপাশি ভ্যানে করে সবজি পরিবহনের কাজ করেন আবু বকর। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও আদায় করেন। তিনি এলাকায় ভালো ছেলে হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। আবু বকর বাইকারদের দলের সঙ্গে যুক্ত। বাইক নিয়ে একসঙ্গে দূর-দুরান্তে ঘুরে বেড়ান।

আবু বকরের মা আসমাউল হুসনা জানান, তার ছেলে নিরীহ, পরিশ্রমী এবং মেধাবী। তাকে এ ঘটনার সঙ্গে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কখনও খারাপ কোনও কাজের সঙ্গে তার ছেলে জড়ায়নি।

যেভাবে আটক

গত ২০ অক্টোবর বিকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজশাহী সফরে আসেন। শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে তিনি নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত বুলেটপ্রুফ বাসের পরিবর্তে রুয়েটের একটি বাসে করে নগরীতে প্রবেশ করেন। এই যাতায়াতের ছবি ‘দ্য বিউটি অব রাজশাহী’ নামের ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হলে আবু বকর তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে স্নাইপার সংক্রান্ত ওই উসকানিমূলক ও হুমকিস্বরূপ মন্তব্যটি করেন।

মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৫ (এসআরবি) যৌথ অভিযান চালিয়ে আবু বকর ও তার বাবাকে রাজশাহী থেকে আটক করে। বর্তমানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিএমপির ডিবি হেফাজতে রাখা হয়েছে।

পুলিশ, ডিবি ও এসআরবি সূত্রে জানা যায়, বুধবার বেলা ২টার দিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও চন্দ্রিমা থানা পুলিশের একটি দল তার বাড়ি যায়। এ সময় আবু বকরকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা তার অবস্থান জানাতে চাননি। বিকাল ৪টার দিকে এসআরবি-৫-এর একটি দল সাদাপোশাকে তার বাড়িতে অভিযানে যায়। আবু বকরকে না পেয়ে তারা বাবা আয়নাল হককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে আয়নাল হক জানান, পবা উপজেলার হাটরামচন্দ্রপুর ঘোলহারিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে আত্মগোপন করে আছে তার ছেলে। পরে এসআরবি বাবা আয়নালকে নিয়েই সেই বাড়িতে অভিযানে যায়। সেখান থেকেই আবু বকরকে আটক করা হয়। সেইসঙ্গে আয়নালকে আটক ও পরিবারের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। আটকের পর দুজনকে ডিএমপির ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বাড়িতে তল্লাশি পুলিশের

বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ওই যুবকের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী তল্লাশি চালিয়েও জব্দ করার মতো কোনও আলামত পায়নি পুলিশ। শুধু একটি পেনড্রাইভের মোড়ক জব্দ করা হয়। পুলিশ আবু বকরের ল্যাপটপ উদ্ধারের চেষ্টা করেছে বলে জানায়। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, আবু বকর ল্যাপটপ ব্যবহার করতেন না। তার ল্যাপটপ নেই।

আটক আবু বকর সিদ্দিক

যা বলছেন আবু বকরের কলেজের শিক্ষকরা

রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আবু বকর সিদ্দিক কলেজের নিয়মিত ছাত্র। প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে। তবে এখনও ফলাফল হয়নি। কলেজে আবু বকর সিদ্দিকের খারাপ কোনও কিছু কখনও দেখিনি। এর আগে কোনও অভিযোগও পাইনি।’ 

তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে তার ওই মন্তব্যের বিষয়টি জানাজানি হলে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাকে জানিয়েছেন আবু বকরের বাবা আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন। ৫ আগস্টের পর জামায়াতের সঙ্গে মিশেছেন। আবু বকর ছাত্রলীগ সমর্থন করতো। তবে কলেজে কখনও রাজনীতি করতে দেখিনি আমরা।’

যা বলছে কলেজ ছাত্রদল

রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মাহমুদ হাসান লিমন বলেন, ‘আমি প্রশাসনের লোকজনের কাছে শুনলাম আবু বকর আগে ছাত্রলীগ করতো। এখন নাকি ছাত্রশিবির করছে। কিন্তু কলেজে আমি তার কোনও দলের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কিছু দেখিনি। তাকে আমরা সেভাবে চিনতামও না।’

ছাত্রশিবির বলছে দোষ চাপানোর চেষ্টা

জানতে চাইলে ছাত্রশিবিরের রাজশাহী মহানগরের সভাপতি ইমরান নাজির বলেন, ‘এখন কিছু হলেই শিবিরের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার একটা অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু আবু বকর আমাদের দলের কেউ নয়।’

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পায়নি পুলিশ

চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আবু বকর আগে কখনও গ্রেফতার হয়েছিল মর্মে থানায় পুলিশ সে রকম কোনও তথ্য পায়নি। তার নামে মামলা ও অভিযোগেরও কোনও তথ্য নেই। এমনকি তার বাড়িতে অভিযান চালিয়েও কিছু পাওয়া যায়নি। কোনও দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও পায়নি পুলিশ।’

গত মঙ্গলবার রাজশাহী এসে বিমানবন্দর থেকে মাদ্রাসা ময়দান, সেখান থেকে ধর্মসভা হয়ে আবার বিমানবন্দরে যাতায়াতের সময় রুয়েটের বাস ব্যবহার করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানায়। প্রধানমন্ত্রীও এতে সাড়া দেন। পরে ‘দ্য বিউটি অব রাজশাহী’ নামের ফেসবুক পেজে প্রধানমন্ত্রীর ওই বাসে বসে থাকার একটি ছবি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে আবু বকর মন্তব্য করে লিখেছেন, ‘ইস! একটা বড় সুযোগ ছিল। শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।’