শাকিল হত্যা মামলা: এমপির ছেলের পর কারাগারে আরও দুই আসামি

নাটোরের গুরুদাসপুরে পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর পর আরও দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে লালপুর আমলি আদালতের বিচারক সাদ্দাম হোসেন তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কারাগারে পাঠানো দুই আসামি হলেন বড়গ্রাম উপজেলার কচুগাড়ি দ্বাড়ীকুসি গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে আলামিন (৩৮) এবং গুরুদাসপুর পৌরসভার খামার নাচকৈর মহল্লার নূর মোহাম্মদের ছেলে আনিছুর রহমান (৪২)। শুক্রবার ভোর ৩টার দিকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে তাদের আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাদের আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিবির ওসি নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নুরুজ্জামান মিন্টুকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। মিন্টুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আলামিন ও আনিছুর রহমানকে আটক করা হয়। হত্যা মামলায় তাদের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত এ মামলায় নতুন করে কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি।

ডিবির ওসি আরও বলেন, শুক্রবার রিমান্ড শেষে মিন্টুকে আদালতে হাজির করে তার আরও সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত রিমান্ড আবেদন গ্রহণ করলেও শুনানি না করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য কোনও তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২)। হামলাকারীরা তাকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম থানায় মামলা করেন। শাকিলের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। এ মামলায় মিন্টুসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

শাকিলের পারিবারিক সূত্র জানায়, হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়। গ্রেফতারের পর মিন্টুকে যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়।

মঙ্গলবার শাকিলের জানাজা শেষে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রাসেলের একটি শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়। বুধবার সকাল থেকে তার একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে অশ্লীল যৌন অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তদন্তের পর আবদুল আজিজের সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে শুক্রবার সকালে বৈঠকে বসে নাটোর জেলা বিএনপি। টানা আট ঘণ্টা বৈঠক করেও তার দলীয় পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি জেলা কমিটি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে সুপারিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আবদুল আজিজ নাটোর জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা কমিটির কোনও যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই।

আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, আমরা সবগুলো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের কাছে আবদুল আজিজের পরিচয় তিনি জেলার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক। এ ছাড়া তিনি একজন সংসদ সদস্য। তাই গঠনতন্ত্র মোতাবেক জেলা কমিটির ক্ষমতা নেই কোনও যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। সর্বসম্মতিক্রমে এ বিষয়ে যেকোনও পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত দলের উচ্চপর্যায়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।

জেলা বিএনপির একটি সূত্রের দাবি, আবদুল আজিজের ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি আসল। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর তার নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যার প্রভাব দলের ওপরও পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে শুক্রবারের বৈঠকে জেলা বিএনপির সদস্যরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। পরে গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে সার্বিক বিষয় কেন্দ্রীয় বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এদিকে বৃহস্পতিবার বিকালে গুরুদাসপুর পৌরসভার খোয়ারপাড়া-খামারনাচকৈড় এলাকায় নিহত শাকিলের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল হাসান রাকিব। তারা অপরাধী যে-ই হোক, সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।