ঈদে দেশে ফেরার কথা ছিল, ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে

দেশে ফিরে ছোট্ট মেয়ে সাফাহ জান্নাকে বুকে জড়িয়ে আদর করবেন। মেয়েকে সোনার চুড়ি বানিয়ে দেবেন। প্রায় প্রতিদিনই ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন। মনের এসব আশার কথা স্ত্রীকে বলতেন শামীম হোসেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ছোট্ট মেয়েটির কাছে ফিরেছেন ঠিকই, তবে কফিনবন্দি হয়ে।

শামীম সৌদি আরবে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা যান। শনিবার (৩১ অক্টোবর) বেলা তিনটার দিকে শামীমের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের সড়ক ধরে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। তখন গ্রামজুড়ে নেমে আসে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা।

বিকাল চারটার দিকে শামীমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের মাতম চলছে। বাড়ির উঠানে খাটিয়ায় রাখা হয়েছে তার মরদেহ। শেষবারের মতো একনজর দেখতে ভিড় করেছেন গ্রামের মানুষ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। ঘরের ভেতরে সন্তানের স্মৃতি মনে করে ডুকরে কাঁদছেন মা শাহিনুর বেগম। মাঝে মাঝে মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুন।

মৃত্যুর আগের দিন সকাল ১০টার দিকে ভিডিও কলে শেষবারের মতো মেয়ের মুখ দেখেছিলেন শামীম। এরপর মেয়ের জন্মের মাত্র ৩৪ দিনের মাথায় সব শেষ হয়ে গেল। পরিবারের আক্ষেপ, ছোট্ট মেয়েটি আর কোনও দিন নিজের চোখে বাবাকে দেখতে পারবে না।

কাঁদতে কাঁদতে শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুন বলেন, প্রবাসে থাকতেই মেয়ের নাম সাফাহ জান্না রেখেছিলেন শামীম। মেয়ের আকিকার জন্য টাকাও পাঠিয়েছিলেন। প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট্ট মেয়েকে কীভাবে বড় করবেন, তা ভেবে দিশেহারা তিনি।

মিতু বলেন, আসন্ন রোজার ঈদের আগে দেশে ফেরার কথা ছিল শামীমের। মেয়েকে সোনার চুড়ি বানিয়ে দেবেন, বুকে জড়িয়ে আদর করবেন এমন কথা বলতেন। ছোট্ট শিশুটিকে নিয়ে কত পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হলো না। মেয়েকে কোলে নেওয়াও হলো না তার।

ছেলেকে হারিয়ে প্রায় পাগলপ্রায় হয়ে গেছেন শামীমের মা শাহিনুর বেগম। বিলাপ করতে করতে তিনি জানান, ছয় লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। ঈদের আগে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই ছেলে ফিরেছেন কফিনবন্দি হয়ে। আর কোনও দিন মা বলে ডাকবে না সন্তান।

শামীমের বাবা জাকির হোসেন জানান, আগুনে তার ছেলের মরদেহ ভয়াবহভাবে পুড়ে গিয়েছিল। এ কারণে পরিচয় শনাক্ত করতে সময় লেগেছে। ৮২ দিন পর ছেলের মরদেহ পেয়েছেন। এখন এটুকুই তাদের বড় সান্ত্বনা। ছেলের মরদেহ দাফন করে অন্তত কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে পারবেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ধারদেনা করে ২০১৬ সালে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শামীম। দেশে ফিরে ২০২১ সালে বিয়ে করেন। দ্বিতীয় দফায় সৌদি আরবে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী ছিলেন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এরপর প্রবাসে থাকা অবস্থায় তাদের ঘরে জন্ম নেয় কন্যাসন্তান।

গত ১০ আগস্ট সৌদি আরবে শামীমের কর্মস্থল সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কারখানাটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকায় শ্রমিকেরা বের হতে পারেননি। ওই ঘটনায় শামীমসহ ১৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সাব্বির ও রবিউল করিমও ছিলেন। তারা নলডাঙ্গা উপজেলার একই ইউনিয়নের বাসিন্দা। প্রথম দফায় রবিউলের মরদেহ দেশে এলেও আগুনে ভয়াবহভাবে পুড়ে যাওয়ায় শামীম ও সাব্বিরের মরদেহ শনাক্ত করতে দেরি হয়। ফলে মৃত্যুর ৮২ দিন পর শনিবার তাদের মরদেহ দেশে আসে।

সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাব্বির আহমেদ (৩০) নলডাঙ্গা উপজেলার একই এলাকার গোলাম রাব্বানীর ছেলে। প্রায় সাড়ে চার বছর আগে সৌদিতে গিয়েছিলেন তিনি। প্রবাসে থাকার কারণে মুঠোফোনের মাধ্যমেই তার বিয়ে দেওয়া হয়। কথা ছিল, আগামী ঈদে দেশে ফিরবেন। ছেলে বাড়ি ফিরলে পুত্রবধূকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরে তুলে আনার কথা ছিল পরিবারের। কিন্তু তার আগেই আগুনে পুড়ে মারা গেলেন সাব্বির।

আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, ছেলে সাড়ে চার বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। প্রবাসে থাকায় মুঠোফোনের মাধ্যমেই তার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কথা ছিল, আগামী ঈদে দেশে ফিরবেন। ছেলে বাড়ি ফিরলে পুত্রবধূকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরে তুলে আনা হবে। কিন্তু ছেলের মৃত্যুতে সবকিছু থমকে গেছে।

গোলাম রাব্বানী বলেন, প্রথমবারের মতো বউমা বাড়িতে এসে স্বামীর কফিন দেখলো। এই কষ্ট কীভাবে সইব?

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে শামীম ও সাব্বিরের মরদেহ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। সাধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে দুজনের বাবার নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মৃত্যুর ৮২ দিন পেরিয়ে শনিবার তাদের মরদেহ দেশে আনা হয়।

শামীম ও সাব্বিরের মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয় শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল থেকেই। সকালে ঢাকা থেকে মরদেহ নিয়ে গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন স্বজনেরা। এদিকে গ্রামের কবরস্থানে প্রস্তুত করা হয় তাদের কবর। বেলা তিনটার দিকে মরদেহ দুটি বাড়িতে পৌঁছায়। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে জানাজা শেষে শামীম ও সাব্বিরকে গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

জানাজায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নলডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম হোসেন।

নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাম্মী আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে নলডাঙ্গার তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে।