গাইবান্ধায় ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ড: পুলিশি তদন্তে অগ্রগতি নেই

গাইবান্ধার জুতা ব্যবসায়ী দেবেশ চন্দ্র প্রামানিক(৬৮) হত্যাকাণ্ডের ৪২ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হলেও গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ এই খুনের রহস্য এবং খুনিদের সম্পর্কে কোনও তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়নি।

জেলা পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই খুনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচিত হচ্ছে। স্বল্পতম সময়ে এ খুনের রহস্য উদঘাটনসহ খুনিদের গ্রেফতারে পুলিশ সক্ষম হবে বলে তিনি আশাবাদী।

এদিকে জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ বাজারের এই ব্যবসায়ীকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। আইএসের সহযোগী সংবাদ সংস্থা আমাক এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতি থেকে এ তথ্য জানা যায়।

দেবেশ চন্দ্র হত্যায় আইএস স্বীকারোক্তি

ওই ওয়েবসাইটের এক ম্যাসেজে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধায় এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধারা।

বুধবার সকাল ৬টায় মহিমাগঞ্জ বাজারে জুতা ব্যবসায়ী দেবেশ চন্দ্র প্রামানিককে তার দোকানে ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এই অবস্থায় পুলিশের তদন্তের অপেক্ষায় লাশ সকাল ১০টা পর্যন্ত ওই দোকানেই পড়ে থাকে। পরে গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ লাশ ময়না তদন্তের জন্য গাইবান্ধা আধুনিক হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যায়।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার রাত ৮টায় দেবেশ চন্দ্রের লাশ মহিমাগঞ্জে নিয়ে এলে এক হৃদয়বিদায়ক দৃশ্যের অবতারণা হয়। দেবেশ চন্দ্রের স্ত্রী আনন্দ রানী, ছেলেমেয়ে ও পরিবারের লোকজন কান্নায় ভেঙে পড়েন।

নিহত দেবেশের শোকাতুর পরিবার

স্থানীয় ওই বাজারের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার সকালে দেবেশ চন্দ্র দোকান খোলার আগে থেকেই তার জুতার দোকানের পাশে লোকবিহীন দু’টি মোটরসাইকেল দাঁড় করানো ছিল। কিন্তু তাকে হত্যার পর আর মোটরসাইকেল দুটি দেখা যায়নি। এমন কথা তারা শুনেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কিলিং মিশন সম্পন্ন করে খুনিরা ওই মোটরসাইকেল দুটিতে পালিয়ে যায়। কিন্ত ওই মোটরসাইকেল দুটি সচক্ষে দেখেছেন এমন কোনও ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি মো মোজাম্মেল হক মনে করেন, এটা গুজব।

কিন্তু এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত খুনের ৪২ ঘন্টা অতিক্রান্ত হলেও গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ এই খুনের রহস্য এবং খুনিদের সম্পর্কে কোনও তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়নি। এমনকি সন্দেহজনকভাবে আর কাউকে গ্রেফতারও করেনি।

ওসি বলেন, নিহতের স্ত্রী আনন্দ রানী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে বুধবার গোবিন্দগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় সন্দেহজনকভাবে আটক নৃপেন চন্দ্রকে আসামি করা হয়নি।

ওসি জানান, আটক নৃপেন চন্দ্রের সঙ্গে এখনও এই খুনের কোন সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। মূলতঃ সে একজন ছিঁচকে চোর, মাদকাসক্ত। তবে আদলতে তার রিমান্ডের জন্য আবেদন করা হবে।

আনন্দ রানী জানান, আটক নৃপেন চন্দ্র অর্থ সংক্রান্ত বচসাকে কেন্দ্র করে একবার দেবেশ চন্দ্রের সঙ্গে বিবাদে জড়ায়। প্রাথমিকভাবে এ থেকেই পরিবারের লোকজন ধারণা করেন, হয়তো শত্রুতার বশে নৃপেন খুন করে থাকতে পারেন। কিন্তু তার স্বামীকে তিনি খুন করেননি। অজ্ঞাত ‘কে বা কাহারা’ তার স্বামীকে খুন করেছে। 

এলাকাবাসীর প্রশ্ন, এমন অজাতশত্রু, সাদাসিধা ও নিরহংকারী একইসঙ্গে শারীরিক প্রতিবন্ধী একজন মানুষকে (দেবেশ চন্দ্র প্রামাণিক) কেন নির্মমভাবে হত্যা করা হবে? উল্লেখ্য, ডান পায়ের পাতাটি না থাকায় খুঁড়িয়ে চলাফেরা করতেন দেবেশ।

এদিকে পুলিশের একটি সূত্র পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, খুনিরা পেশাদার। সম্প্রতি গোবিন্দগঞ্জের ব্যবসায়ী তরুণ দত্তকে যেভাবে ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা হয়েছিল ঠিক একই ভাবে কুপিয়ে দেবেশ চন্দ্রকেও হত্যা করা হয়। দুই কিলিং মিশন একই সূত্রে গাঁথা হতে পারে। 

গোবিন্দগঞ্জের ব্যবসায়ী তরুণ দত্ত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাইবান্ধা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক মো. সাইদুল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওই হত্যা মামলার কোনও কুলকিনারা এখনও করতে পারেনি পুলিশ।

বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সামাদ ও পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা নিহত দেবেশ চন্দ্রের পরিবারের নিরাপত্তা বিধানের আশ্বাস দেন।

আরও পড়ুন: সাভারে ভাড়া বাসা থেকে দুই নারীর মরদেহ উদ্ধার

/এইচকে/