পঞ্চগড়ে সরকারিভাবে গম সংগ্রহ বাণিজ্যে সর্বদলীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি খাদ্য গুদামে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে গম সংগ্রহ করার কথা থাকলেও গম দিয়েছেন সরকারি বেসরকারি প্রশাসন ও সর্বদলীয় একটি সিন্ডিকেট।
জেলা খাদ্য বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি মৌসূমে পঞ্চগড় জেলায় গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১১ হাজার ৯৬৮ মেট্রিক টন। বাজারে প্রতি কেজি গম ২০ থেকে ২২ টাকায় বিক্রি হলেও ওই সিন্ডিকেট প্রতি কেজি গম বিক্রি করেছে ২৮ টাকায়। এ হিসেবে জেলায় ১১ হাজার ৯৬৮ মেট্রিক টন গম ক্রয়ে ওই সিন্ডিকেট ৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
জেলার ৫টি উপজেলার মধ্যে তেঁতুলিয়া থেকে ৩ হাজার ২৮৩ মেট্রিক টন, পঞ্চগড় সদর থেকে ২ হাজার ৯২৩ মেট্রিক টন, আটোয়ারী উপজেলা থেকে ২ হাজার ৩৩৫ মেট্রিক টন, বোদা উপজেলা থেকে ১ হাজার ৭৮৯ মেট্রিক টন এবং দেবীগঞ্জ উপজেলা থেকে ১ হাজার ২৭৫ মেট্রিক টন গম সংহের কথা ছিল। এসব উপজেলার কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে গম কেনার কথা থাকলেও সিন্ডিকেটের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি।
খাদ্য সংগ্রহ কমিটি ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা, বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ, জাসদ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও চিহিৃত ব্যবসায়ীরা যৌথভাবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংগ্রহ অভিযান শেষ করেছেন। এবার গম সংগ্রহ অভিযানে ছিল উপজেলা প্রশাসনও। অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে ওই সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিয়েছেন এ টাকা।
সংগ্রহ অভিযান শুরুর আগেই কৃষকরা গম বিক্রি করে দেন। বিশেষ কারণে মে মাসের শেষের দিকে গম সংগ্রহ শুরু করায় প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে ওই সিন্ডিকেট গম সরবরাহ করে।
বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলায় স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন সরাসরি কৃষকদের হাতে কার্ড সরবরাহ করায় এই দুই উপজেলায় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ও ব্যবসায়ীদের কোনও সিন্ডিকেট করতে পারেনি। তবে এই দুই উপজেলার খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কাজের সম্মানি হিসেবে বস্তা প্রতি ৫০ থেকে একশ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন।
আটোয়ারী, তেঁতুলিয়া ও সদর উপজেলার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ নাজমুল হক প্রধান, আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও গম সংগ্রহ কমিটির আহবায়ক আবু রাফা মো. আরিফ, তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও গম সংগ্রহ কমিটির আহবায়ক শেখ মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও গম সংগ্রহ কমিটির আহবায়ক লায়লা মুনতাজেরী দীনা, আওয়ামী লীগ, জাসদ, বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নেতা ও গম ব্যবসায়ীরা সরাসরি এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তবে সিডিন্ডকেটের হাতিয়ে নেওয়া এ অর্থ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন দফতরেও গেছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, সিন্ডিকেট ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে কৃষকদের কাছ থেকে চেকে সই নেন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন। পরে তাদের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে খাদ্য বিভাগ এবং গুদাম কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গম সংগ্রহ করা হয়।
আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের নলপুখরী গ্রামের কৃষক সহিমদ্দিন আহাম্মেদ, তোড়িয়া ইউনিয়নের মকবুল হোসেন, রমজান আলী, আব্দুল খালেক (৫৫), বলরামপুর ইউনিয়নের ইদ্রিস আলীর অভিযোগ গম উৎপাদন করেছি, বাজারে বিক্রিও করেছি। কিন্তু সরকারি বেসরকারি কোনও তালিকাতেই তাদের নাম নেই। ৫ বিঘা জমিতে গম করেও কোনও কার্ড পাননি।
আর ওই সিন্ডিকেট কৃষককের নামের বরাদ্দকৃত গম ভাগাভাগি করেছে বলে অভিযোগ করেছেন আটোয়ারী উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আবু তাহের।
তেঁতুলিয়া উপজেলার তীরনইহাট ইউনিয়নের ডেমগছ এলাকার কৃষক রিয়াজুল মোল্লা ও একই ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম ও তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের সর্দ্দারপাড়া এলাকার কৃষক মো. শাহজাহজান, মো. শামুল ও মো. আনিছ ৫০ থেকে ২শ’ মন গম উৎপাদন করলেও কেউই গমের কার্ড পাননি। তাদের অভিযোগ, আওয়ামীলীগ, জাসদ, বিএনপি, বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা গম সংগ্রহ অভিযান সম্পন্ন করেছেন। একই অবস্থা সদর উপজেলাতেও।
আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা নুরুল ইসলাম হেলাল গম উৎপাদন করে বিভিন্ন দফতর ঘুরেও একটি গমেরও কার্ড পাননি। তিনি জানান, সরকারি খাদ্য গুদামে গম সরবরাহে কৃষকদের নামে স্থানীয় এমপি নাজমুল হক প্রধান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানসহ গম ব্যবসায়ীরা গম সরবরাহ করেছেন।
বস্তা প্রতি টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বোদা উপজেলা খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা মো. মজলু হোসেন জানান, কৃষকরা গম দিয়েছে আমরা তাদের হিসাব নম্বরে টাকার চেক জমা দিয়েছি। টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
তেঁতুলিয়া খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন ও মির্জাপুর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান রুবেল জানান, স্থানীয় সিন্ডিকেট না দলীয় নেতা না এমপি মন্ত্রী জড়িত তা তারা বলতে পারবেন না। নিজ নিজ উপজেলা সংগ্রহ কমিটির তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের গম সংগ্রহ করা হয়েছে। কৃষকরা ট্রাক্টরে করে গম দিচ্ছেন এমন প্রশ্ন করলে কৃষকরা সম্মিলতভাবে ট্রাক্টরে গুদামে গম নিয়ে আসছেন বলে তারা জানিয়েছেন।
আটোয়ারী উপজেলা গম সংগ্রহ কমিটির প্রধান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু রাফা মো. আরিফ জানান, খাদ্য সংগ্রহ কমিটি অনুমোদিত তালিকা অনুযায়ী খাদ্য গুদাম কর্মকর্তারা কৃষকদের কাছ থেকে গম সংগ্রহ করছেন। তাদের ব্যাংক হিসাবে টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। এখানে অনিয়মের কোনও সুযোগ নেই।
গম সংগ্রহ কমিটির উপদেষ্টা ও পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধান জানান, যারা গম দিয়েছে তারাই টাকা পেয়েছে। তবে সিন্ডিকেটের বিষয়ে তার জানা নেই বলেও জানান তিনি।
/এসএনএইচ/
আপ: এইচকে
আরও পড়ুন: যশোরে চুরির অভিযোগে স্কুলছাত্রকে ‘পুলিশি নির্যাতন’ (অডিও)