কুড়িগ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্প বিফলে, বানভাসিদের মানবেতর জীবন

কুড়িগ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেহাল দশা, উড়ে গেছে ছাদের টিনসপ্তাহকাল ধরে কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমারসহ ১৬টি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায়, জেলায় বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। সোমবার (২৫ জুলাই) সকাল ৬টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানি বৃদ্ধির কারণে প্লাবিত হয়ে পড়েছে নতুন নতুন এলাকা। পানিবন্দি হয়ে দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন জেলার ৫০ ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষ।
এসব এলাকায় কাঁচা-পাকা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলার সদর, চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী, রাজিবপুর ফুলবাড়ী ও নাগেশ্বরীসহ ৯ উপজেলার ৫০ টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। বন্যা দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ঘরে ভিতরে পানি ঢুকে পড়ায় শিশুদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বানবাসি পরিবারগুলো। আর তিস্তা ও বহ্মপুত্রের ভাঙনে পড়ে গৃহহীন হয়ে পড়ছেন কয়েক শ’ পরিবার।

কেমন কাটছে বন্যায় পানিবন্দি মানুষের জীবণ, সরেজমিন অনুসন্ধানে জেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের নৌ ঘাট থেকে নৌকায় প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা যাত্রার পর চর কালির আলগা গ্রামে যায় এই প্রতিবেদক। কিন্তু স্থল ভাগের কোনও চিহ্ন চোখে পড়ে না। চারপাশে শুধু পানি আর পানি। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটি ঘরেই এক বুক পরিমাণ পানি। কেউ নৌকায় বসে আছে, কেউবা ঘরের ভিতর চৌকিতে বসে আছে। চৌকির উপর রন্না, চৌকিতে বসেই  খাওয়া দাওয়া চলছে। বাড়ির টিউব অয়েল এবং শৌচালয় (টয়লেট) সবই পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। গবাদি পশুগুলো পানিতেই দাড়িয়ে আছে। অনেকে আবার বাড়ি-ঘর ফেলে রেখে অন্যত্র চলে গেছেন পরিবার নিয়ে।

চর কালির আলগা গ্রামের অনেকে এক বেলা রান্না করে তিন বেলা খাচ্ছেন। কেউবা রান্নার উপায় না পেয়ে শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন। রাবেয়া খাতুন, শিল্পী আক্তার, আবু বকর, শুকুরন বেওয়া, আবু তাহেরসহ এই গ্রামের  অনেকে এভাবেই এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি জীবন যাপন করছেন। গ্রামের ঠিক পূর্বপাশে অনেকটা উঁচু স্থানে দু’টি আশ্রয়ণ প্রকল্প। কিন্তু এরা কেউ আশ্রয়ণ প্রকল্পে আশ্রয় নেননি। অনেকটা কৌতুহল নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পে আশ্রয় না নেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে সকলে প্রায় একই উত্তর দেন, ‘গিয়া দেখেন, ওখানে মাইনষের থাকার উপায় নাই, গরু-ছাগল রাইখা আইছি।’

আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, পরপর দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্প- ‘বেগম রোকেয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প’ এবং ‘ব্রহ্মপুত্র আশ্রয়ণ প্রকল্প।’। কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো মানুষের থাকার জন্য তৈরি। প্রকল্পের বেশির ভাগ ঘরের চালে কোনও টিন নেই। দু’টি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২২ টি করে মোট ৪৪ টি ব্যারাকে সর্বমোট ২২০ টি পরিবার পুনর্বাসিত হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে মাত্র ৮০/৯০ টি পরিবার থাকতে পারছে। বাকি ব্যারাকগুলোর চাল ও কোনও কোনওটির দরজা জানালা না থাকায়  সেখানে কেউ বাস করতে পারছে না। অথচ এই দুর্যোগ মুহূর্তে বন্যা কবলিত অনেক পরিবার সেখানে আশ্রয় নিতে পারলে তাদের দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হতো।

বেগম রোকেয়া আশ্রয়ণের অধিবাসী আনোয়ার ও জাহানারা বেগমকে প্রকল্পের এমন বেহাল দশা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্প দু’টি প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের দুই তিন মাস পর একবার ঝড়ে আশ্রয়ণের প্রায় ২০/২২ টি ব্যারাকের ঘরের টিনের চাল ভেঙে গেছে। এরপর আর কেউ সেগুলো ঠিক করে দেয়নি। তখন থেকে ওই ব্যারাকের ঘরগুলোয় কেউ থাকতেও পারে না।

আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, সেখানকার অধিকাংশ ঘর মানুষের থাকার অনুপোযোগী। ঘরের চালে টিন নেই, চালে লাগানো লোহার ‘অ্যাঙ্গেল’ নিচে পড়ে আছে। টিন লাগানোর কাজে ব্যবহৃত লোহার পাতলা অ্যাঙ্গেলগুলো দেখলেই বোঝা যায় কতটা নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে। কোনও কোনও ঘরের দরজা জানালা নেই, ঘরের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ঘর থেকে খসে পড়া ইট। টয়লেটগুলোও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। গোটা প্রকল্পজুড়ে মাত্র একটি টিউব অয়েল সচল রয়েছে যা দিয়ে সবক’টি পরিবার তাদের খাবার পানির চাহিদা মেটাচ্ছে। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে তৈরি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো দেখে মনে হবে, পক্ষাঘাতগ্রস্থ একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প।

রবিবার বিকেলে চর কালির আলগা গ্রামের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে ত্রাণ বিতরণ করতে যান কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আক্তার হোসেন আজাদ এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম। তারা প্রথমেই আশ্রয়ণ প্রকল্প দুটি ঘুরে দেখেন।

এসময় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসের অযোগ্য ব্যারাকগুলো সংস্কারের ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম জানান, ‘প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে আমাদেরকে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। আমরা পরিদর্শন করে রিপোর্ট পাঠালে সংস্কারের ব্যবস্থা করা হবে।’ কাজের নিম্নমানের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে কোনও উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান এই নির্বাহী কর্মকর্তা।

এরপর তারা ‘বেগম রোকেয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প’ থেকে ‘ব্রহ্মপুত্র আশ্রয়ণ প্রকল্প’ দুটি পরিদর্শনকালে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আক্তার হোসেন আজাদ ব্যারাকগুলোর টিন, লোহার অ্যাঙ্গেল এবং কংক্রিটের বিম বিচ্ছিন্ন দেখে হঠাৎ বলেই ফেলেন-’ এত নিম্নমানের কাজ, সবকিছু ছুটে গেছে!’ এসময় তাকে থামাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম অনেকটা অস্ফুট স্বরে বলেন, ‘স্যার আস্তে, পিছনে সাংবাদিক!’ যদিও তারা প্রকাশ্যে এ নিয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। যেন প্রকল্প কাজের ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ!

উল্লেখ্য, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত বেগম রোকেয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ও ব্রহ্মপুত্র আশ্রয়ণ প্রকল্প দু’টি প্রধানমন্ত্রীর কার‌্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারীতে নির্মাণ কাজ শুরু করে সেবছরই ২৪০ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রকল্পের নির্মানকাজের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ছিল মেসার্স জারিফ এন্টার প্রাইজ। কাজটির সার্বিক পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়োজিত ছিল বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সহ একাধিক সূত্র। ফলে এর নির্মাণ সামগ্রীর নিম্নমান এবং কাজের ত্রুটি নিয়ে প্রশাসনের কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। আর বসবাসের অযোগ্য হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বানবাসিরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারছেন না।

/এইচকে/আপ-এনএস/

আরও পড়ুন: স্বেচ্ছায় থানায় গিয়ে মুন্না এখন পুলিশ হেফাজতে