এক বছরেই বদলে গেছে বাংলাদেশের মানচিত্রে একীভূত হওয়া সবচেয়ে বড় ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার দৃশ্যপট। যেখানকার শিশুরা লেখাপড়ার ইচ্ছে থাকলেও স্কুলের অভাবে নিরক্ষর থেকে যেতো বছরের পর বছর, সেখানকার ছেলেমেয়েরা এখন আনন্দে লাফাতে লাফাতে স্কুলে যায়; উচ্চশিক্ষার জন্য মেয়েরাও সাইকেল চালিয়ে নির্ভয়ে চলে আসছে ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজ। ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ, চলছে রাস্তা সংস্কার ও পাকাকরণের কাজ। পেশাগত প্রয়োজনে বাংলাদেশের কোনও প্রান্তে যেতে এখন আর কাউকে পরিচয় লুকাতে হয় না। এই নতুন অভিজ্ঞতা বছরজুড়েই আনন্দে বিহ্বল করে রেখেছে কুড়িগ্রামের সাবেক ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার নতুন বাংলাদেশিদের। একই অবস্থা ছোট ছোট অন্য সাবেক ছিটমহলগুলোরও। সত্যিকার অর্থেই উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে এসব এলাকা।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় ও দেশ দুটির মূল ভূখণ্ডে এসব ছিটমহল একীভূত হওয়ার প্রথম বর্ষপূতি আজ ৩১ জুলাই রবিবার। ৬৮ বছরের গ্লানি, বঞ্চনা আর অন্ধকার পথ পেরিয়ে গত বছর এই দিন ঠিক রাত ১২টায় ছিটমহলের জনগণ সংশ্লিষ্ট মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত হয়। এ উপলক্ষে শনিবার ছিটমহলগুলো ঘুরে ও নতুন বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
কুড়িগ্রামের তিন উপজেলায় মোট ১২টি ছিটমহল থাকলেও ফুলবাড়ি উপজেলার একমাত্র ছিটমহল দাশিয়ারছড়া বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলগুলোর মধ্যে আয়তন এবং লোকসংখ্যায় সর্ববৃহৎ। বলা বাহুল্য, এই ছিটমহলসহ ১১১টি ছিটমহলের জনগোষ্ঠী এখন বাংলাদেশের মূল ভূ-খণ্ড ও জনসংখ্যার সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে। প্রশাসনিকভাবেই এদের পরিচয় ‘নতুন বাংলাদেশি’।
রাষ্ট্র ও নাগরিকত্ব পাওয়া বিলুপ্ত এই ছিটমহলগুলোর জনগণ বিগত এক বছরে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে যে উন্নয়ন ও অধিকারের ছোঁয়া পেয়েছে তাতে তাদের সন্তুষ্টির পাল্লাই ভারি। গত এক বছরে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে দৃশ্যমান অনেক সুবিধাই পেয়েছেন তারা।
বিলুপ্ত ছিটমহলগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবার বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছে। গোটা এলাকা জুড়ে রয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ লাইন। সম্পন্ন হয়েছে ভূমি জরিপের কাজ। নাগরিকত্ব নিশ্চিতে গেজেট প্রকাশের পাশাপাশি ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির কাজও। যুব উন্নয়ন অধিদফতরের পক্ষ থেকে স্থানীয় বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর থেকে দেওয়া হয়েছে টিউবওয়েল এবং স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে দেওয়া হয়েছে নানা কৃষি উপকরণ সহায়তা। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মসজিদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ইমাম। চলছে মন্দির পাকাকরণের কাজ। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যে কোনও সমস্যায় সেখানে মিলছে চিকিৎসা সেবা।
কুড়িগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জয়নাল আবেদীন জিল্লুর জানিয়েছেন, দাশিয়ারছড়া ছিটমহলে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় সব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সেখানে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্য ক্লিনিক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
যুগের পর যুগ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এখানকার ছেলেমেয়েরা এখন আর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না। এক সময়ের বিদ্যালয় শূন্য বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে স্থানীয়দের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে একটি মাদ্রাসা ও দুটি বালিকা বিদ্যালয়সহ পাঁচটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। যেখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে। যদিও বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয়নি, তবে খুব শীঘ্রই এসব প্রতিষ্ঠান অনুমতি পেয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
দাশিয়ারছড়ার সমন্বয় পাড়ার বাসিন্দা ও ফুলবাড়ি ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়শা সিদ্দিকা ও রাবিয়া খাতুন জানান, মাত্র এক বছর আগেও তারা নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে ফুলবাড়ির গঙ্গাহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেছেন। তখন তারা নিজেদের ঠিকানা দিয়েছিলেন দাশিয়ারছড়ার পার্শ্ববর্তী গ্রাম আজোয়াটারী। কিন্তু এখন তারা নিজেদের পরিচয় আর ঠিকানা দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করছে। হাসি মুখে তারা জানান, তাদের ঠিকানা এখন দাশিয়ারছড়া, বাংলাদেশ।
ফুলবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবেন্দ্রনাথ উঁরাও জানান, ফুলবাড়ি উপজেলা এলজিইডির তত্ত্বাবধায়নে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে দাশিয়ারছড়ায় তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ফলে এখানকার ছোট ছেলেমেয়েদের আর দূরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনা করতে হবে না।
বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা চালুকরণের ব্যাপারে এই কর্মকর্তা জানান, তালিকা প্রস্তুত করে সমাজসেবা অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে। আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বর মাসে এ ভাতা চালু হতে পারে।
এদিকে, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে শুরু হয়েছে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কার্যক্রম। রাস্তা প্রশস্তকরণসহ শুরু হয়েছে পাকাকরণের কাজও।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মলয় কুমার চক্রবর্তী জানান, কুড়িগ্রামের ভেতরে বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর উন্নয়নে প্রায় ১৮ কোটি টাকার টেন্ডার সম্পন্ন করা হয়েছে। এর মধ্যে পাকা রাস্তা এবং কালভার্ট নির্মাণের কাজ রয়েছে যা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন মাদকদ্রব্য চোরাকারবারের জন্য এক সময়ের বিখ্যাত এই বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে এখন কোনও চোরাকারবারিও খুঁজে পাওয়া যায় না। স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। এক সময় সামান্য বিষয় নিয়ে ছিটমহলগুলোতে মারামারি হলেও কোনও আইনি সহায়তা পেত না এখানকার জনগণ। কিন্তু এখন তারা যেকোনও প্রয়োজনে পাচ্ছেন আইনি সহায়তা।
অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থায়ী করা হবে জানিয়ে কুড়িগ্রাম পুলিশ সুপার তবারক উল্লাহ বলেন, ‘আমরা দাশিয়ারছড়ায় একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। ক্যাম্প স্থাপনের জায়গা খোঁজা হচ্ছে। জায়গা পেলে শীঘ্রই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এতোসব উন্নয়ন কার্যক্রম ও প্রাপ্তির পরও উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে কারও কারও। তবে সে অভিযোগ অপ্রাপ্তির নয়, উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের অন্তর্ভুক্ত না করে ছিটমহল বিনিময়ের বিরোধিতাকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ায়।
বিলুপ্ত বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাশিয়ারছড়া ইউনিটের সভাপতি আলতাফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মোজাফ্ফর হোসেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নূর ইসলামসহ স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেন, যারা ছিটমহল বিনিময়ের বিরোধিতা করেছিল প্রশাসন এখন তাদেরকে সংশ্লিষ্ট করে এবং অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের মাধ্যমে এখানকার অধিবাসীদের সরকারি নানা বরাদ্দ, বণ্টন করে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর এবং লজ্জা ও কষ্টের বিষয় কেননা যারা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে প্রশাসন তাদেরকে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমরা চাই এখানকার সব নাগরিক সমান সুবিধা পাক।
বিলুপ্ত বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক ও দাশিয়ারছড়ার অধিবাসী গোলাম মোস্তফা উল্লেখিত অভিযোগ সমর্থন করে বলেন,‘আমাদের কষ্ট আর ঘাম ঝরানো আন্দোলনের ফসল হিসেবে আমরা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ।’
দাশিয়ারছড়ার অধিবাসীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় সাবেক সমন্বয় কমিটির এই নেতা বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে যেন ছিটমহল বিনিময়ের স্বপক্ষের লোকদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে করে চলমান কাজগুলোর সঠিক মান নিশ্চিত করা যাবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, সরকার যেন সব বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা সুবিধার ব্যবস্থা করে।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিলুপ্ত ছিটমহলের অধিবাসীদের নতুন ফোঁটা ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তারা প্রত্যেকেই আমাদের কাছে সমান। আমরা কারও প্রতি কোনও বৈষম্যমূলক আচরণ করছি না।’ নতুন এই নাগরিকদের নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজ রাত ১২টা ১ মিনিটে দাশিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজার প্রাঙ্গনে ৬৮টি মোমবাতি এবং একটি বৃহৎ মশাল প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময় দিবস উদযাপন করা হবে। এ সময় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে। এ সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি আমিনুল ইসলাম মঞ্জু মণ্ডল এবং সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আলীসহ জেলার অন্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও ১ আগস্ট দিনব্যাপী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
/বিটি/টিএন/
আরও পড়ুন: