বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাইবান্ধায় শুরু হয়েছে তীব্র নদী ভাঙন।এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষ। এই মানুষগুলোর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পাড়ের বাতাস। এরইমধ্যে নদী গর্ভে ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে গাইবান্ধা সদরের কামারজানি ইউনিয়নের ১নং গো ঘাট, মাঝিপাড়া, সাহাপাড়া ও সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নের খানাবাড়ী গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার। ভাঙনের মুখে পড়েছে গো ঘাট গ্রামের রাস্তার পশ্চিম অংশ, কামারজানী বাজার, কলমু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, মসজিদ মন্দিরসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।
অসহায় মানুষরা নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষায় মাইকিং করে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভাঙনের তীব্রতার কাছে কোনও কিছুই টিকছে না। তাই কেউ কেউ এই ভাঙনের হাত থেকে সহায় সম্পত্তি রক্ষা করতে আগভাগেই ঘর-দরজা আসবাবপত্র ও গাছ-গাছালি কেটে অন্যত্র সড়িয়ে নিচ্ছে।
একই চিত্র সুন্দরগঞ্জের বেলকা ইউনিয়নের নবাবগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারি ইউনিয়ন, সাঘাটার বরমতাইড়, গোবিন্দি, হলদিয়ার গোবিন্দপুর, কানাইপাড়া, ভরতখালি, ফুলছড়ি উপজেলার দেলুয়াবাড়ি, উড়িয়ার কালাসোনা, রতনপুর, দক্ষিণ কাবিলপুর, কঞ্চিপাড়ার পূর্ব কঞ্চিপাড়া, এরেন্ডাবাড়ির জিগাবাড়ি ফজলুপুর ইউনিয়নের কুচখালি, চন্দনস্বর, পশ্চিম খাটিয়ামারি, উত্তর খাটিয়ামারি গ্রামের।
সরেজমিন শনিবার বিকালে গাইবান্ধা সদরের কামারজানি ইউনিয়নের ১নং গো ঘাট গ্রামে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। কেউ ঘরের চাল খুলছে, কেউ কাটছে গাছ। আবার কেউ ঘোড়ার গাড়িতে করে, কেউ নৌকা করে মালামাল নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। শত শত বছর ধরে বসবাস করা পূর্ব পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়ার সময় মানুষগুলো আপনজন হারানোর মত হাউ মাউ করে কাঁদছেন। আবার কেউ নির্বাক হয়ে গেছেন। যার পানি ও পলিতে এ মানুষগুলোর জমির ফসল উৎপন্ন হয়েছে। আবার কেউ এর বুকে নৌকা চালিয়ে, মাছ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। সেই চিরচেনা ব্রহ্মপুত্র আজ কেন রাক্ষুসী রূপ ধারণ করেছে।
হঠাৎ দেখতে পাই ব্রহ্মপুত্র নদের পারে নির্বাক হয়ে বসে থাকা পঞ্চাশোর্ধ এক মহিলাকে। জানা যায়, তার নাম রুবিনা আকতার। তিনি ঢেউ দেখিয়ে বলেন, ওইখানে তার বাড়ি ছিল। রাক্ষুরি গাং তার ভিটেমাটি, ঘরদরজা সব গিলে খেয়েছে। সব হারিয়ে এখন রাস্তার উপর দুই ছেলে ও স্বামীসহ আশ্রয় নিয়েছেন।
গো ঘাট গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছে ভাঙন রোধে সরকার থেকে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের কথায় বিশ্বাস নেই। তাই এলাকাবাসী গত শুক্রবার মাইকিং করে নিজেরাই উদ্যোগ নিয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে নদী ভাঙন রোধে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের কাছে বাঁশ দিয়ে পাইলিং করে দুই হাজার বালুর বস্তা নদীতে ফেলে। কিন্তু পরদিন (শনিবার) সেই পাইলিং এর কোনও অস্তিত্তই খুঁজে পাওয়া যায়নি।। তাদের এই উদ্যোগ দেখে অবশেষে এগিয়ে আসে পানি উন্নয়ণ বোর্ড। আগের স্থান থেকে একটু উত্তরে বাঁশের পাইলিং করে বালু বস্তা ফেলার কাজ শুরু করেছে পাউবো।
ওই গ্রামের লিখিল চন্দ্র দাস বলেন, ৫৮ বছরধরে আমারা এই পৈত্রিক ভিটায় বাস করছি। এটা ভেঙে গেলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো। কতো সাংবাদিক, মন্ত্রী, এমপি আসলো কিন্তু কেউ কিছু করলো না। কত কষ্ট করে বাড়ি করলাম এক বছরও থাকতে পারলাম না। আমরা জেলে মানুষ এখন কোথায় গিয়ে থাকবো।
পরবা চন্দ্র দাস নিজের ভাষায় বলেন, জায়গা জমির অনেক দাম, ‘জায়গা কিনবার না প্যায়া এটি আছি। কিন্তু এখন হামরা বাড়িঘর সরেয়্যাও কূল পাচ্ছি না। বাঁন্দোতও জায়গা নেই যে সেটি য্যায়া থাকমু। অনেক আশা নিয়্যা আছিনু, নদীর কাম হবে কিন্তু হলো না।’
মাসুদ করিম নিজের ভাষায় বলেন, তিন তিনবার বাড়ি ভাঙ্গি নিয়্যা এটি আশ্রয় নিছি। কিন্তু এখন কোনটে যাব। আমরা ভোট দিয়ে তো এমপি বান্যায়াছি কিন্তু তিনি হামারঘোরের কোনও খোঁজ নেয় না।
ওই গ্রামের বাসিন্দা কামারজানি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সোলাইমান ইসলাম জানান, ভাঙন ঠেকাতে না পারলে গো ঘাট গ্রাম ব্রহ্মপুত্রে বিলিন হয়ে যাবে। ভিটেমাটি হারাবে এই এলাকার ২ হাজার পরিবার। হারিয়ে যাবে কামারজানি বাজার, কলমু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, মসজিদ, মন্দিরসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।
গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানান, গো-ঘাটে বাঁশের পাইলিং করে বালির বস্তা ফেলানোর কাজ অব্যাহত আছে। দুই / এক দিনের মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলানো হবে। ভাঙনরোধে ওই এলাকায় স্থায়ী কাজের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, অন্যান্য এলাকাতেও পাউবো ভাঙন ঠেকাতে যথাসাধ্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
/জেবি/
আরও পড়তে পারেন : হাতিটি আপাতত বাংলাদেশেই থাকছে