অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারের সীমান্ত পথে টেকনাফ হয়ে ইয়াবা এবং দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত পথে ফেনসিডিল, হেরোইনসহ অন্যান্য মাদক বগুড়ায় আসছে। সেখান থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। কেউ কেউ শরীরেও মাদক বহন করে থাকে। গোপনে খবর পেয়ে মাঝে মাঝে র্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা সামান্য কিছু মাদক জব্দও করেন। বহনকারী বা পরিবহন শ্রমিকরা গ্রেফতার হলেও গডফাদাররা কখনই গ্রেফতার হন না। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেরাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দিয়ে একটি গাড়ি বা মাদক বহনকারীকে ধরিয়ে দেয়। ফোর্স ওই ঘটনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে বড় চালানগুলো পার হয়ে যায়।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, বগুড়ায় আসা ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনের বড় চালান শহরের মাদক ঘাঁটি খ্যাত চকসুত্রাপুর এলাকায় আসে। সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠনের কিছু অসাধু নেতাকর্মী এ মাদকের পাইকারি ক্রেতা। তারা নানা মাধ্যমে মাদক দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেয়। কোনও কোনও এলাকার বাড়িতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে এরা মাদক ব্যবসায় সহযোগিতা করে থাকে। কিছুদিন আগে পুলিশ ধুনট উপজেলায় অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে সিসি ক্যামেরা, মনিটর ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করে। বগুড়া শহরের সুলতানগঞ্জ পাড়া, কাটনার পাড়া, বাদুড়তলা, রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশের ঝুপড়ি, সেউজগাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিশেষ করে ইয়াবা ট্যাবলেটের ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। বহনে সুবিধা হওয়ায় এসব এলাকার বিভিন্ন বয়সের নারী ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করে থাকে। মোবাইল ফোন কলের মাধ্যমে ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি হয়। আবার ফোন দিলে ব্যবসায়ীরা পৌঁছে দিয়ে আসে। শহরের হাকিরমোড় এলাকায় একটা দোকানে প্রায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়ে থাকে। ওই দোকানে রাতে পুলিশের আড্ডাও দেখা যায়। ওই ব্যবসায়ীকে জেলে রাখা যায় না। মাদক বিক্রি করে ওই দোকানি অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে। বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বগুড়া রেল স্টেশনের পশ্চিম পাশে মাদক বিক্রি হয়ে থাকে। নতুন কোনও মানুষ ওই এলাকায় গেলে মাদক বিক্রেতারা তাদের ঘিরে ধরে বিক্রির জন্য।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী জানান, তারা এ ব্যবসার জন্য তিনটি ক্যাশ (টাকা) রাখেন। এক ক্যাশ দিয়ে মাদক ক্রয়, দ্বিতীয় ক্যাশ দিয়ে প্রশাসন ম্যানেজ এবং তৃতীয় ক্যাশ দিয়ে আদালত থেকে জামিন লাভ। তাই অর্থশালী মাদক ব্যবসায়ীদের কখনও জেলে থাকতে হয় না। ধরা পড়লেও তাড়াতাড়ি জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। তারা মন্তব্য করেন, র্যাব, পুলিশ কখনও শহরের মাদকের চিহ্নিত এজেন্ট রাজনীতিকদের গ্রেফতার করে না। তারা শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সেবিদের গ্রেফতার করে থাকে। যে কারণে এ জেলায় মাদকের ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না। এছাড়া বড় মাদক ব্যবসায়ীরা অনেক রাজনীতিককে ফ্রি ইয়াবা সরবরাহ দিয়ে নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
র্যাব-১২ বগুড়া ক্যাম্পের সদস্যরা গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকালে দুপচাঁচিয়া উপজেলার বিশা গ্রামে অভিযান চালিয়ে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার ও ৩১০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করেছে। ডিবি পুলিশ গত ৭ সেপ্টেম্বর ভোরে শহরতলির মাটিডালি মোড়ে দিনাজপুর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী একটি ট্রাক থেকে ৪০০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার ও চালক রঞ্জু প্রামাণিক কালুকে গ্রেফতার করে। ফেনসিডিলগুলো ধানের গুড়ার বস্তায় বহন করা হচ্ছিল। বগুড়া জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা গত ৫ আগস্ট ধুনটে ৫০০ বোতল ফেনসিডিলসহ একটি ট্রাক আটক করেন। পরদিন রাতে র্যাব-১২ বগুড়া ক্যাম্পের সদস্যরা বগুড়া শহরের কালিতলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৭৯০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার ও তোতা মিয়া নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছেন।
বগুড়ার সিনিয়র এএসপি (মিডিয়া) গাজিউর রহমান জানান, বিভিন্ন সীমান্ত পথে মাদক এলেও অধিকাংশই জব্দও পাচারকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদেরও গ্রেফতার করা হয়ে থাকে। কিন্তু এরা জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার ব্যবসা শুরু করে।
তিনি আরও জানান, মাদকের গডফাদারদের সন্ধান পেলে অবশ্যই তাদের গ্রেফতার করা হবে। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনের একার পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর বিরুদ্ধে সামাজিক গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
আরও পড়ুন:
আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেলেন সজীব ওয়াজেদ জয়
/বিটি/