কুড়িগ্রামের রৌমারীতে স্বামী-স্ত্রী হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে বাদ দিয়ে মামলা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এলাকার প্রভাশালী একটি মহল ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিতে চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছের হত্যাকাণ্ডের শিকার দম্পতি গোলাম হোসেন এবং শিল্পী খাতুনের পরিবারের লোকজন।
জানা যায়,নিহত গোলাম হোসেন পাবনায় তাঁত শ্রমিকের কাজ করতেন। স্বামী বাড়িতে না থাকার সুযোগে শিল্পী খাতুনকে স্থানীয় বখাটে কামরুল, সানাউল্লাহ, আবদুল আউয়াল, মাজম আলী ও শামসুল হক প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতো বলে অভিযোগ করেন স্বজনরা। এ নিয়ে সালিশ বৈঠকও হয়েছে একাধিকবার। আর এরাই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে দাবি স্বজনদের।
নিহত শিল্পী খাতুনের মা মিলন মালা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার মেয়েকে সাবেক চেয়ারম্যান কাদেরের ছেলে কামরুলসহ আরও চারজন বিরক্ত করতো। আমার মেয়ে ব্রাকের স্বাস্থ্যকর্মীর কাজে রাস্তায় বের হলে তারা (অভিযুক্তরা) মেয়ের কাপড় ধরে টানতো, বিভিন্ন কুপ্রস্তাব দিতো। রাতে ঘরের পিছনে গিয়া বেড়ায় মাইর দিতো। তারে টাকার লোভ দেখাইয়া কুপ্রস্তাব দিতো। কিন্তু পুলিশ তার নামে মামলা নেয় নাই। চেয়ারম্যানের ছেলেরে বাদ দিয়া মামলা করতে বাধ্য করছে।’
আঁচলে চোখ মুছতে মুছেতে তিনি বলেন, ‘আমার ফুলের মত মা, হেরা সকলে মিইলা তারে হত্যা করছে। আমার ঘরের বাতি নিভায় দিছে, আমি এর বিচার চাই।’
শিল্পীর ছোট বোন সেলিনা বলেন, ‘চেয়ারম্যানের ছেলে কামরুল ও তার সহযোগী আউয়াল, সানোয়ার (সানাউল্লাহ), মাজম আলী ও শামছুল হক আমার বোনকে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করতো। পুলিশে অভিযোগ করেও কোনও প্রতিকার পাই নাই।’
এদিকে, নিহত গোলাম হোসেনের প্রতিবেশী ময়না খাতুন জানান, গোলাম হোসেন বাইরে কাজ করতো। এই সময় এলাকার কিছু ছেলে শিল্পীকে বিরক্ত করতো। এই নিয়ে এলাকায় দুদফা সালিশও বসেছিল। তারা সেই বখাটেদের নামে থানায় জিডিও করেছিল।
হত্যাকাণ্ডের দিন সকালে গোলাম হোসেনের মা বাহাতনের ডাকে ছুটে এসে প্রথম লাশ দেখেন প্রতিবেশী মালেকা। তিনি জানান, ঘরের দরজা চাপানো ছিল। হাত দিয়ে জোরে ঠেলা দিতেই দরজা খুলে যায়। কিন্তু পুলিশ কেন বলছে দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল তা তারা জানেন না।
মালেকা বলেন,'গোলাম হোসেনের বউ শিল্পী দেখতে অনেক সুন্দর আছিল। এলাকার ৪/৫ জন পোলাপাইন শিল্পীরে অনেকদিন থাইকা বিরক্ত কইরতো। তারাই দুই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা কইরছে। আমি নিজে দরজা খুলছি, দরজা খুলতে কোনও জোর করতে হয় নাই, দরজা ভাঙতেও হয় নাই।'
গোলাম হোসেন-শিল্পী খাতুন দম্পতি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করলে সাবেক চেয়ারম্যানের ছেলে কামরুলের নাম বাদ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন মামলার বাদী নিহত শিল্পীর বাবা আব্দুস ছাত্তার।
তিনি বলেন, ‘আমি কাদের চেয়ারম্যানের ছেলে কামরুলসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তার নাম বাদ দিয়ে চারজনের নামে মামলা নিছে।’
তিনি আরও জানান, তার মেয়ে শিল্পীকে বাইটকামারী গ্রামের কাদের চেয়ারম্যানের ছেলে কামরুল, একই গ্রামের শরীয়ত উল্যাহর ছেলে আব্দুল আউয়াল (৩০) শামছুল হক (২৭), তালু শেখের ছেলে সানোয়ার হোসেন (২৬) ও আবুল হোসেনের ছেলে মাজম আলী (২৮) দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। এই নিয়ে তারা থানায় জিডি করেন এবং সাবেক চেয়ারম্যান কাদেরের বাড়িতে একাধিকবার সালিশও হয়েছিল। তারপরও প্রতিকার না পেয়ে শিল্পী পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়ে আর মেয়ে জামাইয়ের জীবন রক্ষা হলো না। অভিযুক্ত বখাটেরাই তাদের হত্যা করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে, ছেলের নাম অভিযুক্তের তালিকায় না নিতে কাদের চেয়ারম্যানকে নিয়মিত রৌমারী থানায় ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে। তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ছেলে কামরুলের নাম এজাহারে উল্লেখ করতে দেননি বলে অভিযোগ নিহত দম্পতির পরিবার ও এলাকাবাসীর।
রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবিএম সাজেদুল ইসলাম জানান, তদন্ত চলছে। তদন্তে যাকেই দায়ী পাওয়া যাবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কেউ বাদ যাবে না। আশাকরি খুব দ্রুত আসামি গ্রেফতার হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভোররাতে উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নের বাইটকামারী এলাকায় নিজ ঘরের ভেতরে গোলাম হোসেনের ঝুলন্ত ও স্ত্রী শিল্পী খাতুনের মেঝেতে পড়ে থাকা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ সংক্রান্ত আগের খবর:
রৌমারীর ওই দম্পতিকে ‘হত্যা’ করা হয়েছে
/বিটি/