তেল বরাদ্দ না থাকায় এক যুগ ধরে বন্ধ হাসপাতালের জেনারেটর

 

Gaibandha Health Jenarator-2জ্বালানি তেলের বরাদ্দ না থাকায় গাইবান্ধা সদর আধুনিক হাসপাতালের বিশাল জেনারেটরটি দীর্ঘ একযুগ ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে জেনারেটরের ব্যাটারিসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এদিকে, রোগীদের কেনা মোমবাতি দিয়ে কোনও মতো কাজ চলছে।

গাইবান্ধার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর ডিজেল ইঞ্জিনচালিত ৪০ কেভির এই জেনারেটর বরাদ্দ দেয়। এতে ব্যয় হয় সাত লাখ টাকা। এছাড়া জেনারেটর রাখার জন্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। বৈদ্যুতিক সামগ্রীসহ মোট ব্যয় হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

জেনারেটরের ক্ষমতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গাইবান্ধা বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ৪০ কেভির (কিলো ভোল্ট) এই জেনারেটর থেকে ৩২ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এটি চালু থাকলে অপারেশন, এক্সরে মেশিন ও শীতাতপযন্ত্র চালানো ছাড়াও গোটা হাসপাতাল এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এমনকি এটি একটি বড় শিল্প কারখানায় বিদ্যুতের চাহিদা মেটাবে।

Gaibandha Health Jenarator -3এদিকে, জেনারেটর স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিলো লোডশেডিংয়ের সময় অন্যতম চিকিৎসা কেন্দ্র ১০০ শয্যার এই হাসপাতালের সকল শাখায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। যাতে জরুরি অপারেশন কাজে বিঘ্ন না ঘটে। কিন্তু সরকারিভাবে জ্বালানি তেলের বরাদ্দ না থাকায় বাস্তবে এটি চালানো যাচ্ছে না। ফলে এটি রোগীদের কোনও কাজে আসছে না। এমনকি জেনারেটর চালানোর জন্য লোকবলও নেই।

গাইবান্ধা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারি প্রকৌশলী মাহফুজুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় জেনারেটরের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যান্য যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে যাচ্ছে।

জেনারেটর তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত হাসপাতালের ওয়ার্ডমাস্টার মকবুল হোসেন বলেন, ‘দুবৃর্ত্তরা বেশ কয়েকবার ঘরের ভেন্টিলেটর ভেঙে জেনারেটরের যন্ত্রাংশ চুরির চেষ্টা চালায়।’  

শুক্রবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যার পর হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকলে রোগীদের দুর্ভোগের চিত্র। বেশিরভাগ শয্যার পাশে টেবিলে খাদ্যের পাশাপাশি দিয়াশলাই ও মোমবাতি রাখা হয়েছে। চিকিৎসাধীন রোগীরা জানালেন, লোডশেডিংয়ের সময় রোগীর ওয়ার্ডসহ অন্যান্য বিভাগে ভূতুড়ে অবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন রোগীর আনা মোমবাতি কিংবা কুপিই একমাত্র ভরসা।

হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন গাইবান্ধা সদর উপজেলার চাপাদহ গ্রামের মাসুমা বেগম (৩৮) আক্ষেপ করে বলেন, ‘সনদেত (সন্ধ্যা) থাকি দুই-তিন ঘণ্টা কারেন (বিদ্যুৎ) থাকে না। কারেন না থাকলে পায়খানাত যাওয়া যায় না। সোরকারি হাসপাতালোত চিকিতসা করব্যার আসি আনদরোত (অন্ধকারে) থাকান নাগে।’

পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সদর উপজেলার শিবপুর গ্রামের শ্যামল চন্দ্র (৪৮) বলেন, ‘সাতদিন থাকি হাসপাতালোত আচি। আইতোত (রাতে) শহরোত কারেন থাকে না। পোত্তেক দিন আইতোত  (রাতে) ৫/৬টা করি মোমবাতি পুরব্যার নাগচি। হামরা গরিব মানুষ। ওসুদ-পত্য কিনমো নাকি মমবাতি কিনমো।’

মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ফুলছড়ি উপজেলার রতনপুর গ্রামের মোরশেদা খাতুন (৪৫) বলেন, নিয়মিত ওয়ার্ড পরিষ্কার না করায় ময়লা, কলার খোসা, খাবারের পরিত্যক্ত অংশ পড়ে থাকে। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে ভূতুরে অবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন পায়খানায় যেতে কলার খোসায় পিছলে দুর্ঘটনা ঘটছে। অথচ জেনারেটরের ব্যবস্থা নেই।

বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা কি জানতে চাইলে সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) শাহীনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বেসরকারিভাবে পাওয়া ছোট দুইটি জেনারেটর দিয়ে কোনমত জরুরি বিভাগ ও হাসপাতালের প্রধান ফটকে বাতি জ্বালানো হচ্ছে।

জেনারেটর চালুর ব্যাপারে পদক্ষেপ কী প্রশ্ন করা হলে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন নির্মালেন্দু চৌধুরী বলেন, জেনারেটরটি চালাতে প্রতি ঘণ্টায় ১৩ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তেল কেনার কোনও তহবিল নেই। এমনকি এটি চালানোর জন্য লোকবলও নেই।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জেনারেটর দেওয়া হলেও জ্বালানি তেলের বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে ডিজেলের বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনও কাজ হচ্ছে না।

/বিটি/