এছাড়াও রয়েছে আবাসন সমস্যা। ৩০ একর জমির ওপর একতলা বিশিষ্ট মোট ৬৪টি বাড়ি রয়েছে এখানে। যার প্রতিটিতে রুম আছে পাঁচটি। প্রত্যেক পরিবারকে একটি রুম দেওয়া হয়েছে। এখানে মোট পরিবার রয়েছে ২৯৮টি। একেকটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে ছয়জন পর্যন্ত। ফলে তাদের জন্য একটি কক্ষে বসবাস করা খুবই কষ্টকর। আবার কোনও কোনও পরিবার রয়েছে যেখানে বাবা-মা, ছেলে, ছেলের বউ এবং নাতিকে নিয়ে একই কক্ষে বসবাস করেন।
প্রায় ৭০ বছর বয়স্ক আবু তাহের। বাড়ি ছিল বড়পুকুরিয়া খনি এলাকার জিগাগাড়ী গ্রামে। পার্শ্ববতী মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরছিলেন। সাংবাদিক দেখে এগিয়ে আসেন তিনি। বলেন, ‘এগুলা লিখি নিয়া কি হবে, হামাক তো এংকরিই থাকিবা হবে। একটা ঘরত ৫ জন মিলি থাকা যায়? ব্যাটার বিয়া হইছে, ৩ বছরের একটা ছওয়াল আছে। ব্যাটা, ব্যাটার বউ নাতিক নিয়া ঘরত থাকে। আর হামরা বুড়া-বুড়ি বাহিরত থাকি।’
আবু তাহের এক সময় বড়পুকুরিয়া বাজারে হলুদের ব্যবসা করতেন। তার ছেলে সাদেকুল ইসলামও এই দোকানে বসতেন। পাশাপাশি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করতেন। কিন্তু খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের ফলে বড়পুকুরিয়া বাজার দেবে গেছে। হঠাৎ পানির নিচে তলিয়ে যাবেন এই আশঙ্কায় বাড়ি ছেড়েছেন, পাশাপাশি ছেড়েছেন ব্যবসাও। ছেলে সাদেকুল ইসলাম বড়পুকুরিয়া খনি এলাকা দেবে গিয়ে যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে সেখানে মাছ ধরে উপার্জন করেন। আর সেই উপার্জনের টাকা দিয়েই কোনোমতে চলে তাদের সংসার।
জামিরুল ইসলাম (৫৫) নামে একজন জানান, তাদের এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব নাজুক। ফলে কেউ অসুস্থ হলে সময়মত হাসপাতালে পৌঁছানো যায় না।
ফরিদা নামে এক বৃদ্ধা জানান, এখানে আসার পর বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতার কার্ড পাননি তারা। এমনকি এখন সরকার গরিব-দুস্থদের জন্য ১০ টাকা দরে যে চাল বিক্রি করছেন সেটাও তারা পাচ্ছেন না। তারা শুনেছেন ভূমিহীনদের নাকি চাল দেওয়া হয় না!
তার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ করা মেহেরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তাদেরকে বলা হয়েছিল খনিতে চাকরি দিবে। তাদেরকে ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, কিন্তু দেওয়া হয়নি চাকরি। এখানে যে ঘর দেওয়া হয়েছে তার কোনও কাগজপত্রও দেওয়া হয়নি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এই ঘরে থাকতে পারবেন কিনা।
সুখে-দুখে পাশে থাকা, তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, ভবিষ্যতে যাতে কেউ উঠিয়ে দিতে না পারে সেজন্য ওই এলাকায় একটি মৌখিক কমিটি রয়েছে। ওই কমিটিরই একজন সদস্য মকসেদুল ইসলাম।
তিনি জানান, ১০ শতক বা তার নিচে যাদের জমি আছে তাদেরকে ভূমিহীন বলে বিবেচিত করে এই পুনর্বাসন প্রকল্পে কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট ৩২০টি কক্ষ রয়েছে এখানে। এরই মধ্যে ২৯৮টি কক্ষ বরাদ্দ ও হস্তান্তর হয়েছে। কিন্তু বাকি ২২টি কক্ষ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। ২২টি কক্ষের জন্য আবেদন আছে শতাধিক। অনেক পরিবারই আছে যাদেরকে ভূমিহীন হিসেবে তালিকাভুক্তও করা হয়নি আবার টাকাও দেওয়া হয়নি এমনকি এখানে কক্ষও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম বলেন, মোটামুটিভাবে ক্ষতিপূরণ দিয়েই তাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে যদি পুনর্বাসন কেন্দ্রে কোনও ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে তা দূর করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বিষয়টি এখনও কেউ প্রশাসনকে অবহিত করেনি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পদক্ষেপ নেব। তাদের বসবাসে যাতে কোনও সমস্যা না হয় সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
/বিটি/