‘কয়লা খনি আমাদের জীবনটা কয়লা বানিয়ে দিয়েছে’

কয়লা খনির ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীনদের জন্য গড়ে তোলা পুনর্বাসন প্রকল্প‘কয়লা খনি আমাদের জীবনটা কয়লা বানিয়ে দিয়েছে। নিজের জায়গা না থাকলেও আগে আমার স্বামী অন্যের জমি আধি (বর্গা চাষ) করতো, কিন্তু নতুন জায়গায় কেউ জমি দিতে চায় না। তাই কোনোদিন অন্যের জমিতে কামলা খেটে আর কোনোদিন বাড়িতে বসেই দিন কাটাই। কয়লা খনি না হলে আমাদের জীবনটা এমন হতো না। খনির জন্য ভিটেমাটি ছেড়ে দিলেও খনিতে আমাদের চাকরি হয়নি। নিজ জায়গা থেকেও এখন আমরা পরবাসী।’ আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ পলাশবাড়ী এলাকায় কয়লা খনির ক্ষতিগ্রস্থ ভূমিহীনদের জন্য গড়ে তোলা আশ্রয়ন (পুনর্বাসন) প্রকল্পতে বসবাস করা বাবু ইসলামের স্ত্রী আফরোজা বেগম।

আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাসকারীরা বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এলাকায় বাড়িঘর ছেড়ে যারা এখানে বসবাস করছেন তাদের অধিকাংশরই সমস্যা জীবিকা নির্বাহ। আগে যারা কৃষি জমি আধি বা বর্গা নিয়ে, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, রিকশা-ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো এখানে আসার পর তাদের সেই উপার্জনের জায়গায় ভাটা পড়েছে। নতুন বলে এখনও তারা পরিচিত হতে পারেনি এলাকায়। আর তাই তাদেরকে জমি বর্গা দিচ্ছে না কেউই। যারা রাজমিস্ত্রি-কাঠমিস্ত্রি, লেবার-শ্রমিক, দিনমজুরের কাজ করতো তাদের অবস্থা ‘পুরাতন বৈরাগী ভাত পায় না- নতুন বৈরাগীর আগমন’-এর মত।

এছাড়াও রয়েছে আবাসন সমস্যা। ৩০ একর জমির ওপর একতলা বিশিষ্ট মোট ৬৪টি বাড়ি রয়েছে এখানে। যার প্রতিটিতে রুম আছে পাঁচটি। প্রত্যেক পরিবারকে একটি রুম দেওয়া হয়েছে। এখানে মোট পরিবার রয়েছে ২৯৮টি। একেকটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে ছয়জন পর্যন্ত। ফলে তাদের জন্য একটি কক্ষে বসবাস করা খুবই কষ্টকর। আবার কোনও কোনও পরিবার রয়েছে যেখানে বাবা-মা, ছেলে,  ছেলের বউ এবং নাতিকে নিয়ে একই কক্ষে বসবাস করেন।

মোস্তাকিন সরকারের পাঁচজনের পরিবার কিন্তু বরাদ্দ একটি কক্ষসমস্যার এখানেই শেষ নয়। মোট পাঁচটি পরিবারের জন্য একটি তারাপাম্প, একটি বাথরুম ও দুটি স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা রয়েছে। যা ২০ থেকে ২৫ জন মানুষের ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট নয়। ইতিমধ্যেই তারাপাম্পগুলোর বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। পুনর্বাসন প্রকল্পের মানুষের জন্য নেই মসজিদ। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে ঘরে। বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই থাকে লোডশেডিং। নতুন জায়গায় আসার পরে বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, স্বল্পমূল্যে ১০ টাকা কেজি দরে চালসহ সরকার প্রদত্ত সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এসব মানুষ।

প্রায় ৭০ বছর বয়স্ক আবু তাহের। বাড়ি ছিল বড়পুকুরিয়া খনি এলাকার জিগাগাড়ী গ্রামে। পার্শ্ববতী মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরছিলেন। সাংবাদিক দেখে এগিয়ে আসেন তিনি। বলেন, ‘এগুলা লিখি নিয়া কি হবে, হামাক তো এংকরিই থাকিবা হবে। একটা ঘরত ৫ জন মিলি থাকা যায়? ব্যাটার বিয়া হইছে, ৩ বছরের একটা ছওয়াল আছে। ব্যাটা, ব্যাটার বউ নাতিক নিয়া ঘরত থাকে। আর হামরা বুড়া-বুড়ি বাহিরত থাকি।’

আবু তাহের এক সময় বড়পুকুরিয়া বাজারে হলুদের ব্যবসা করতেন। তার ছেলে সাদেকুল ইসলামও এই দোকানে বসতেন। পাশাপাশি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করতেন। কিন্তু খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের ফলে বড়পুকুরিয়া বাজার দেবে গেছে। হঠাৎ পানির নিচে তলিয়ে যাবেন এই আশঙ্কায় বাড়ি ছেড়েছেন, পাশাপাশি ছেড়েছেন ব্যবসাও। ছেলে সাদেকুল ইসলাম বড়পুকুরিয়া খনি এলাকা দেবে গিয়ে যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে সেখানে মাছ ধরে উপার্জন করেন। আর সেই উপার্জনের টাকা দিয়েই কোনোমতে চলে তাদের সংসার।

জামিরুল ইসলাম (৫৫) নামে একজন জানান, তাদের এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব নাজুক। ফলে কেউ অসুস্থ হলে সময়মত হাসপাতালে পৌঁছানো যায় না।

দিনাজপুরআরিফ নামে এখানে বসবাসকারী এক যুবক জানান, তাদেরকে বড়পুকুরিয়া বাজারের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু ওই রাস্তাটি দিন দিন দেবে যাচ্ছে। এরই মধ্যে রাস্তায় পাথর, ইট-মাটি দিয়ে উঁচু করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিনিয়তই মাটি দেবে যাওয়ার ফলে দুই এক বছরের মধ্যেই রাস্তাটি পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে চলাচলের অযোগ্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফরিদা নামে এক বৃদ্ধা জানান, এখানে আসার পর বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতার কার্ড পাননি তারা। এমনকি এখন সরকার গরিব-দুস্থদের জন্য ১০ টাকা দরে যে চাল বিক্রি করছেন সেটাও তারা পাচ্ছেন না। তারা শুনেছেন ভূমিহীনদের নাকি চাল দেওয়া হয় না!

পুনর্বাসন প্রকল্পের বাসিন্দারা মতিয়ার রহমান (৬৫) নামে এক রাজমিস্ত্রি জানান, এখানে এসে তার উপার্জন অর্ধেকে নেমে গেছে। আগে সপ্তাহের সাত দিনই কাজ করতেন, কিন্তু এখন সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ দিন বসে থাকতে হয়। তিনি জানান, এলাকায় নতুন তাই কাজের ডাক পান না।

তার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ করা মেহেরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তাদেরকে বলা হয়েছিল খনিতে চাকরি দিবে। তাদেরকে ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, কিন্তু দেওয়া হয়নি চাকরি। এখানে যে ঘর দেওয়া হয়েছে তার কোনও কাগজপত্রও দেওয়া হয়নি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এই ঘরে থাকতে পারবেন কিনা।

সুখে-দুখে পাশে থাকা, তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, ভবিষ্যতে যাতে কেউ উঠিয়ে দিতে না পারে সেজন্য ওই এলাকায় একটি মৌখিক কমিটি রয়েছে। ওই কমিটিরই একজন সদস্য মকসেদুল ইসলাম।

তিনি জানান, ১০ শতক বা তার নিচে যাদের জমি আছে তাদেরকে ভূমিহীন বলে বিবেচিত করে এই পুনর্বাসন প্রকল্পে কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট ৩২০টি কক্ষ রয়েছে এখানে। এরই মধ্যে ২৯৮টি কক্ষ বরাদ্দ ও হস্তান্তর হয়েছে। কিন্তু বাকি ২২টি কক্ষ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। ২২টি কক্ষের জন্য আবেদন আছে শতাধিক। অনেক পরিবারই আছে যাদেরকে ভূমিহীন হিসেবে তালিকাভুক্তও করা হয়নি আবার টাকাও দেওয়া হয়নি এমনকি এখানে কক্ষও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম বলেন, মোটামুটিভাবে ক্ষতিপূরণ দিয়েই তাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে যদি পুনর্বাসন কেন্দ্রে কোনও ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে তা দূর করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

বিষয়টি এখনও কেউ প্রশাসনকে অবহিত করেনি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পদক্ষেপ নেব। তাদের বসবাসে যাতে কোনও সমস্যা না হয় সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।’

/বিটি/