সাঁওতাল পল্লীর লোকজন ও আদিবাসী পরিষদের নেতাদের অভিযোগ, গত ৬ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে ওই জমিতে এক চালা ঘরে বসবাসকারী সাঁওতাল ও কিছু বাঙালিকে উচ্ছেদ করে। এসময় পুলিশের উপস্থিতিতে চিনিকলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর কিছু লোক ওইসব বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এ সময় তারা তাদের ঘরে থাকা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ গৃহস্থালী জিনিসপত্র লুট করে নেয়। ভুক্তভোগীরা আরও জানান, পরের রাতে আবারও তাদের স্থায়ী বসতবাড়ি মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ায় হামলা করে গরু-ছাগল লুট করে একই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর লোকজন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৭ নভেম্বর দ্বিতীয় হামলার রাত থেকে উচ্ছেদ করা ওই এলাকাগুলো পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। আর তাদের উপস্থিতিতেই সাঁওতালদের পুড়িয়ে দেওয়া ঘরবাড়ির নিশানা ট্রাক্টর দিয়ে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছে চিনিকল কর্তৃপক্ষ। মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্র এই চারদিনে ওই এলাকার কিছু জমি আখচাষের জন্য প্রস্তুতও করা হয়ে গেছে। অন্যদিকে, সাহেবগঞ্জ-বাগদা ইক্ষু খামার এলাকায় দুই গজ পর পর সিমেন্টের পিলার দিয়ে তাতে বাঁধা হচ্ছে কাঁটাতার। গত কয়েকদিনে প্রায় ১ হাজার গজ বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে।
এদিকে, ওই উচ্ছেদ ঘটনার পর সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার সংলগ্ন সাঁওতাল পল্লী মাদারপুর ও জয়পুর পাড়ার বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে গেছে। সন্তানরা স্কুল-কলেজে যাচ্ছে না। কৃষক ও শ্রমিকরা তাদের নিয়মিত কাজে ফিরতে পারছেন না। হাট-বাজারে যেতে পারছেন না। মামলায় আসামি হয়ে গ্রামের অনেক পুরুষ বাড়ি ছাড়া হয়ে আছেন এখনও। ঘরে খাবার না থাকায় খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল আউয়াল বলেন, 'অনেক আগেই কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া উচিত ছিল। বেড়া দেওয়া হয়নি বলেই খামারের জমি দখল হয়ে যায়। গত ১ জুলাই হুট করেই ঘরবাড়ি তোলে সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর লোকজন। তাদের তীর-ধনুকের সামনে আমরা বাধা দিতে পারিনি। সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় এমপিকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। একাধিকবার পুলিশ উচ্ছেদে গেলেও তীর-ধনুকের আক্রমণে তা সম্ভব হয়নি। গত ৬ নভেম্বরের ঘটনাটা ছিল কাকতালীয়। আমরা খামারে শান্তিপূর্ণভাবে আখ বীজের জন্য আখ কাটতে গেলে সাঁওতালরা তীর-ধনুক নিয়ে আক্রমণ করায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়।'
তিনি আরও বলেন, 'খামারের জমি এতদিন অবৈধ দখলদাররা দখল করে ছিল। দখলদাররা চলে গেছে।এখন তা আখ চাষের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।'
গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত কুমার সরকার বলেন, 'সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি। তাই মিল শ্রমিকরা জমি চাষ করছেন। এ ছাড়াও পরবর্তীতে যেন কোনও ধরনের অঘটন ঘটতে না পারে সেদিকেও দৃষ্টি রাখা হয়েছে।'
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান জানান, 'রচিকের আওতাধীন উপজেলার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের দখল হয়ে যাওয়া ১২শ’ একর জমির বিষয়ে এখন রংপুর চিনিকল সংশ্লিষ্টরা দায়িত্বশীল হলে লোকসানের হাত থেকে মিলটি রক্ষা করা সম্ভব হবে।'
প্রসঙ্গত গত রবিবার (৬ নভেম্বর) গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রংপুর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে তীরবিদ্ধ হয়েছেন ৯ জন পুলিশ সদস্য এবং গুলিবিদ্ধ হন ৪ জন সাঁওতাল। এছাড়া তিনজন সাঁওতাল নিহত হন। পরবর্তীতে ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পুলিশ ও র্যাবের নেতৃত্বে যৌথ অভিযানে ওই জমিতে এক চালা ঘর তৈরি করে দখলে থাকা সাঁওতাল ও কিছু বাঙালিকে উচ্ছেদ করা হয়।
এই ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রবিবার রাতে ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে সাড়ে ৩শ’ জনকে আসামি দেখিয়ে মামলা দায়ের করেন। এপর্যন্ত পুলিশ চার জনকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু হত্যা ঘটনায় এখনও কোনও মামলা হয়নি। এই ঘটনায় কোনও তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়নি।
জানা গেছে, যে জমি নিয়ে সংঘর্ষের শুরু, সেখানে আখের খামার তৈরির উদ্দেশ্যে তৎকালীন পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয় ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই। চুক্তির ৪ নং শর্তে বলা হয়, ‘যে উদ্দেশ্যে এ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তা ছাড়া অন্য কোনও কাজে এ সম্পত্তি ব্যবহার করা যাবে না। চুক্তির ৬ নং শর্তে বলা হয়, জমি অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইলে সরকারের লিখিত আদেশ লাগবে। এছাড়া ৫ নং শর্তে আরও বলা আছে, যে উদ্দেশ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তা ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হলে আগে তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, যাতে সরকার জমি মুক্ত করে ফেরত দিতে পারে।’
২০০৪ সালে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে লোকসানে থাকা রংপুর চিনিকলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০০৬ সালে মিলটি আবার চালু হলেও বিরোধপূর্ণ ওই খামারের জমিতে আখ চাষের পাশাপাশি অন্য ফসল আবাদের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে ইজারা দেয় চিনিকল কর্তৃপক্ষ।
এতে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তোলেন স্থানীয় বাঙালি ও সাঁওতালরা। পরে জমির মালিকানা দাবি করে আন্দোলনে নামেন তারা। স্থানীয় বর্তমান জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনেও চুক্তিভঙ্গের বিষয়টি উঠে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় বাঙালি ও সাঁওতালরা গত ১ জুনে ওই জমিতে ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করে। ওই সময় থেকে গড়ে ওঠা শত শত ঘর গত ৬ নভেম্বর পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন-
‘বেঁচে থাকতে এই বিচার দেখে যেতে চাই’ (ভিডিও)
/এফএস/টিএন/