তিন বছর ধরে পালিত হচ্ছে না দিনাজপুর মুক্ত দিবস

দিনাজপুরএকাত্তরে দেশের কোন অঞ্চল কোন দিন মুক্ত হয়েছিল এর রয়েছে সঠিক ইতিহাস। যথাযোগ্য মর্যাদায় সেই দিবসগুলো পালিতও হচ্ছে। তবে ব্যতিক্রম দিনাজপুর জেলা। এ জেলার মুক্ত দিবস নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। যার ফলে গত ৩ বছর ধরে পালিত হচ্ছে না এ দিবসটি।  এ বিরোধ মিটিয়ে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে সঠিক দিন-তারিখ র্নিণয় করার দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা।

২০১১ সালের আগে ১৪ ডিসেম্বরকেই দিনাজপুর মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা হতো। তবে ২০১১ সাল থেকে ১৫ ডিসেম্বরকে দিনাজপুর মুক্ত দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এ দিবসটি পালন করা শুরু করে। তবে ২০১৪ সালে দিনাজপুর মুক্ত দিবস নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। আর যার ফলে ২০১৪ সাল থেকে দিনাজপুর মুক্ত দিবস পালন কর্মসূচি বন্ধ করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের কারও মতে, দিনাজপুর মুক্ত হয়েছিল ১৪ ডিসেম্বর, আবার কারও মতে দিনাজপুর মুক্ত হয়েছিল ১৫ ডিসেম্বর। তবে কারও কারও মতে, ১৬ ডিসেম্বরেও পরেও দিনাজপুরে পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থান ছিল এবং মুক্তিযোদ্ধারা দিনাজপুরে প্রবেশ করতে পারেননি। যার ফলে তাদের মতে, দিনাজপুর পুরোপুরিভাবে মুক্ত হয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর।

তবে দিনাজপুর জেলা মুক্ত দিবস নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও এ জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় ১৮ ডিসেম্বর। তৎকালীন ৭নং সেক্টরের চেয়ারম্যান এবং সংবিধান প্রনয়ণ কমিটির সদস্য অ্যাড. এম আব্দুর রহিম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

দিনাজপুরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুসারে, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতেই মুক্তিযোদ্ধাদের হামলার মুখে পাকিস্তানি সেনারা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। ৮ ডিসেম্বর চিরিরবন্দরে মুক্তিযোদ্ধারা ৫১ জন রাজাকারকে বন্দি করে। ১০ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা বিরলে পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটির ওপর হামলা চালান। ১১ ডিসেম্বর বিরলে হানাদার বাহিনী হামলা চালিয়ে বহু নিরিহ মানুষকে হত্যা করে চলে যায়। ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা বিরলের ৪৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে সৈয়দপুরের দিকে রওয়ানা হয়। ১৪ ডিসেম্বর বিরল উপজেলার মঙ্গলপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিত্রবাহিনী যোগ দেয়। এরপর ওইদিনই হানাদাররা কাঞ্চন নদীর রেলওয়ের লোহার ব্রিজ, ভুষিরবন্দর ব্রিজ, মোহনপুর ব্রিজ, দিনাজপুর টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভেঙ্গে দেওয়াসহ অনেক ক্ষতি করে। এর পরে কবে কোন দিন দিনাজপুর থেকে পাকিস্তানি বাহিনী চলে যায় তা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কারও মতে, ১৫ ডিসেম্বরে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে কোনঠাসা হয়ে পাকিস্তানি সেনারা সৈয়দপুরে চলে যায়। আবার কারও মতে, ১৪ ডিসেম্বরেই তারা চলে যায়। আবারও কোনও কোন মুক্তিযোদ্ধার মতে ১৭ ডিসেম্বরও জেলার বিভিন্ন স্থানে হানাদাররা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এবং অনেকেই জেলায় প্রবেশ করতে পারেননি। তাই তাদের মতে, দিনাজপুর মুক্ত হয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর।

দিনাজপুর জেলা সেক্টর কমান্ডার ফোরামের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ জানান, বিতর্ক থাকলেও তার মতে ১৬ ডিসেম্বর এবং ১৭ ডিসেম্বরেও তারা গঙ্গারামপুর থেকে দিনাজপুরে প্রবেশ করতে পারেননি। দিনাজপুরের একাংশে পাকিস্তানি সেনারা ছিল। ১৮ তারিখে দিনাজপুর থেকে হানাদাররা চলে যাওয়ার পর তারা প্রবেশ করেছেন। পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন হয়েছিল ও প্রশাসন চালু হয়েছিল। তাই ১৮ ডিসেম্বর দিনাজপুর মুক্ত দিবস।

তৎকালীন দিনাজপুর জেলার জয়বাংলা বাহিনীর প্রধান মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম তালুকদার জানান, তারা ১৪ তারিখ সন্ধ্যায় দিনাজপুরে প্রবেশ করেছেন। সন্ধ্যার আগে আগেই পাকিস্তানি সেনারা দিনাজপুর জেলার শহর ত্যাগ করে চলে যায়। পরে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাতে তারা আনন্দ করেছেন। তাই তার মতে ১৫ ডিসেম্বর দিনাজপুর পুরোপুরি মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা যেতে পারে।

দিনাজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান কমান্ডার সিদ্দিক গজনবী জানান, ১৬ ডিসেম্বরে তিনিসহ তার সঙ্গীরা দিনাজপুরে প্রবেশ করেন। সকালে তারা দেখতে পান পাকিস্তানি সেনারা কারাবন্দিদের মুক্ত করে দিয়ে চলে গেছে। তার ব্যক্তিগত হিসাব অনুযায়ী দিনাজপুর মুক্ত দিবস ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু এ নিয়ে মতবিরোধ থাকায় এবং এর সমাধান না হওয়ায় মুক্ত দিবস পালন কর্মসূচি বন্ধ রাখা হয়েছে। এবারও এই দিবসটি পালন করা হবে না বলে জানান তিনি।

তবে ১৮ ডিসেম্বর দিনাজপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল এ নিয়ে কারও মতবিরোধ নেই। তাই ১৮ ডিসেম্বর দিনাজপুরে পতাকা উত্তোলন দিবস কর্মসূচি পালন করা হবে।

দিনাজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মকসেদ আলী মঙ্গলীয়া বলেন, ‘দিনাজপুর একটি সীমান্তবর্তী জেলা। মুক্তিযোদ্ধারা সেই সময়ে বিভিন্ন দিক দিয়ে দিনাজপুরে প্রবেশ করেন। কেউ আগে প্রবেশ করতে পেরেছেন আবারও কেউ প্রবেশ করতে পারেননি। তাই দিনাজপুর মুক্ত নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। তবে সর্বসম্মতিক্রমে দিনাজপুর মুক্ত দিবস নির্ণয় করতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বসার আলোচনা চলছে। সবার সম্মতিক্রমে এই দিবস নিয়ে জটিলতার নিরসন হবে।’

আরও পড়ুন- 


নিখোঁজ ৭ জনকে নিয়ে সংশয় পুলিশের, মেলেনি খোঁজ

/এফএস/