এক সময় সাঁওতালদের প্রধান পেশা ছিল বন্য প্রাণী শিকার করা। তীর-ধুনক নিয়ে ঝোপ-জঙ্গলে শিকার করত তারা। কালের পরিবর্তনে তাদের পেশাও পরিবর্তন হয়েছে। পেশার পরিবর্তন হলেও একমাত্র সম্বল হিসেবে রয়ে গেছে তীর-ধনুক। এটা দিয়ে তারা করছে শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেদের জান-মাল রক্ষা করে। ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ-বাগদা ইক্ষু খামারের জমি থেকে উচ্ছেদের সময়ও তাদের একমাত্র অস্ত্র ছিল তীর-ধনুক। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ইক্ষু খামার থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয়। এরপর থেকেই ভয়ে তটস্থ সাঁওতালরা তাদের অবশিষ্ট সম্পদ রক্ষার্থে দিনরাত তীর-ধুনক নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন।
ঘটনার এক মাস ১০ দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল পল্লীতে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নেওয়া সাঁওতালদের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। প্রতিনিয়ত হুমকি, গ্রেফতারের ভয় ও ফের হামলার আশঙ্কায় তারা তীর-ধনুকের সঙ্গে দা, কুড়াল ও লাঠি নিয়ে পাহাড়া দিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (১৫) ডিসেম্বর বিকালে মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীতে ঢোকার মুখেই এই প্রতিবেদকের পথ রোধ করেন তীর-ধনুক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাঁওতালরা। প্রথমে নাম পরিচয় জানতে চান। এরপর কোথা থেকে এবং কেন এসেছেন তা জানানোর পর সাঁওতাল পল্লীতে প্রবেশ করতে দেন।
এরপর মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, গির্জার সামনে খোলা আকাশের নিচে শত শত পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। ত্রিপল (তাবু), কাপড়ের ছাউনির ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন তারা। দিনের আলোতে ভালো থাকলেও সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভয় ও আতঙ্ক বাড়তে থাকে তাদের। এছাড়া শীতের মধ্যে এমন তাবুর মধ্যে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার পুরো সাঁওতাল পল্লীর রাস্তা, বিভিন্ন মোড় ও খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেওয়া জায়গার একটু ফাঁকে ফাঁকে হাতে তীর-ধনুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সাঁওতালরা। অনেক সাঁওতাল এখন জীবনের নিরাপত্তার জন্য নতুন করে তীর-ধনুক তৈরি করছেন।
মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীতে নিজের তাবুর সামনে বসে ধনুক তৈরি করছেন ময়রা হেমরন। তিনি বলেন, ‘উচ্ছেদ ঘটনার পর থেকে সাঁওতালরা ভয় আর আতঙ্কে ভুগছেন। আবারও হামলার আশঙ্কায় রয়েছেন। আমাদের কাছে যে পরিমাণে তীর-ধুনক আছে তা দিয়ে যে কোনও হামলা বা শত্রুকে মোকাবিলা কার সম্ভব নয়। তাই নতুন করে অনেকে এখন তীর-ধনুক তৈরি করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঠিক মতো বাইরে যেতে পারি না। হাট-বাজারও বন্ধ। বাইরে গেলে বিভিন্ন লোকজন হুমকি দেয়। মাঝে মাঝে তারা মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল পল্লীতে হামলা চালানোর হুমকিও দেন। এ কারণে তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ আছেন। যে কোনও হামলার ঘটনা তারা তীর-ধুনক দিয়ে মোকাবিলা করবেন।’
কিসরো সরেন বলেন, ‘জীবন রক্ষার জন্য এখন দিনরাত হাতে তীর-ধুনক নিয়ে পাহারা দিতে হচ্ছে। কখন, কিভাবে আমাদের ওপর হামলা হবে তা জানি না। তাই জীবন ও নিজেদের শেষ সম্বল রক্ষার জন্য তীর-ধুনকই এখন একমাত্র হাতিয়ার।’
বার্নাবাস বলেন, ‘সাঁওতালদের উপর যে কোনও ধরনের হামলা মোকাবিলার জন্য সাঁওতালরা তীর-ধুনক, দা, কুড়াল দিয়ে প্রস্তুত থাকছে। ৬ নভেম্বরের ঘটনার পর সাঁওতালরা চরম আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা আর নিরাপত্তাহীরতায় দিন কাটাচ্ছেন। তাই বাধ্য হয়ে এখন পুরুষ সাঁওতালরা তীর-ধনকু হাতে পুরো মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া পাহাড়া দিচ্ছেন।’
এ বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত কুমার সরকার বলেন, ‘সাঁওতাল পল্লীতে আশ্রয় নেওয়া সাঁওতালদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের নজরদারী রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য সাহেবগঞ্জ এলাকায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ওইসব জমিতে মিল কর্তৃপক্ষ আখ চাষ না করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর কাছে লিজ প্রদান করে। তারা লিজ নেওয়ার পর ওইসব জমিতে তামাক, ধান, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করতে থাকে। এছাড়া এসব জমিতে ১২টি পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছে প্রভাবশালীরা।
মিলের জমিতে আখ চাষ না হওয়ায় দুই বছর আগে এসব জমি বাপ-দাদার জমি ফেরত দেওয়ার কথা বলে প্রভাবশালী নেতারা এসব সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অসহায় লোকজনকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে। ৬ নভেম্বর পুলিশ-কারখান শ্রমিক ও সাঁওতালদের সঙ্গে ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিন সাঁওতালের নিহত হন। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি ও সাঁওতালদের পক্ষ থেকে দুটি মামলা দায়ের হয়। মামলায় এ পর্যন্ত পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেফতার করেছে।
/এসটি/