আজ ৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার। ২০১৫ সালের এই দিনে গাইবান্ধার সদর উপজেলার তুলসীঘাটে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির জোটের হরতাল-অবরোধের সময় ঢাকাগামী নাপু এন্টারপ্রাইজ নামে যাত্রীবাহী নৈশ কোচে পেট্রোল বোমা হামলায় শিশু ও নারীসহ মারা যায় আটজন। আজ এ হামলার দুই বছর পূর্ণ হলো। পুরো গাইবান্ধাবাসী এই দিনটিকে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ও আতঙ্কের দিন হিসেবে স্মরণ করে।
সেদিনের পেট্রোল বোমা হামলায় শিশুসহ আটজনের মৃত্যু ও অন্তত আরও ৪০ জন অগ্নিদগ্ধ হন। প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকের দেহে আজও আগুনের ক্ষত লেগে আছে। হতাহত এসব পরিবারের মধ্যে আজও থামেনি কান্না।
ঘটনার রাতের সেই ভয়াল স্মৃতি মনে পড়লে এখনও আতঙ্কে শিউরে ওঠেন হামলায় বেঁচে যাওয়া সাধারণ মানুষ ও উদ্ধার কর্মীরা। ঘটনার দিনে নৈশ কোচের যাত্রী হিসেবে বাসটিতে যারা ছিলেন, তাদের অধিকাংশই ছিল দিন মজুর।
জানা গেছে, ঢাকাগামী নাপু এন্টারপ্রাইজের কোচটি ২০১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সীচা পাঁচপীর থেকে ৫০-৬০ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পথে গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কের পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বুড়িরঘর নামক স্থানে বাসটি পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়। এতে নিমিষেই কোচটিতে আগুন ধরে যায় এবং ঘটনাস্থলেই ৬ জন নিহত ও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ২ জনের মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন- সদর উপজেলার মালিবাড়ি ইউনিয়নের আব্দুল গফুর মিয়ার ছেলে আবুল কালাম আজাদ (৩০), খোলাহাটি ইউনিয়নের পশ্চিম কোমরনই গ্রামের জিলহজ আলী (৩৫), সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ কালীর খামার গ্রামের খয়বর হোসেন দুলুর ছেলে সৈয়দ আলী (৪২), পশ্চিম সীচা গ্রামের সাইব মিয়ার মেয়ে হালিমা বেগম (৪২), চন্ডিপুর গ্রামের শাজাহান আলীর ছেলে সুমন মিয়া (২২) একই গ্রামের বলরাম দাসের মেয়ে শিল্পী রাণী দাস (১০), চন্ডিপুর গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে সুজন মিয়া (১০) ও তার স্ত্রী সোনাভান বিবি (৪৫)।
এদিকে, পেট্রোলবোমা হামলার দুই বছর হলেও নিহত-আহতের পরিবারের সদস্যরা ঘটনার পর পরেই সরকারিভাবে সামান্য কিছু আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। তবে এরপর থেকে এখন আর কেউ তাদের খোঁজ রাখেনি। বর্তমানে স্বামী, ছেলে-স্ত্রী কিংবা স্বজন হারিয়ে তাদের অনেকেই এখন মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
সেদিনে বেঁচে যাওয়া তারা মিয়া বলেন, স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার এয়ারপোর্ট এলাকায় থাকতাম। বাসে আগুনের ঘটনায় স্ত্রী ও ছেলেকে হারিয়েছি। ছোট কন্যা শিশু তানজিনাকে নিয়ে এখন আমার সংসার। ঘটনার পর সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছিলাম। এখন সরকারি বরাদ্দের টাকা প্রতি মাসে সাড়ে ১০ টাকা টাকা সোনালী ব্যাংক থেকে উত্তোলন করতে পারি। এছাড়া আর কেউ কখনও পরিবারের খোঁজ নেয়নি। হামলাকারীদের গ্রেফতার করে তাদের সব্বোর্চ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
বেঁচে যাওয়া আরেকজন বলরাম দাস বলেন, ‘স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে ঢাকার বালুগাঁ এলাকায় কাজ করতাম। বাড়ি থেকে বাসে ঢাকা যাওয়ার সময় মেয়ে শিল্পী রাণী দাস তার মায়ের কোলে ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ করে আগুন ধরে বাসে। দ্রুত বাস থেকে স্ত্রীকে নিয়ে নামলেও আগুনে পুড়ে যায় শিল্পী। মেয়েকে হারানোর আজ দুই বছর হলে। কিন্তু বাসে যারা আগুন দিলো তাদের বিচারতো হলো না। মেয়েকে আর খুঁজে পাব না, কিন্তু মেয়ে হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম মেহেদী হাসান জানান, মামলার এক বছর পর তদন্ত সম্পন্ন ও মেডিক্যাল রিপোর্ট পাওয়ার পর বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ৭৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন। এছাড়া এ মামলায় ৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদেরকেও গ্রেফতার করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
জেলা জজ ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. শফিকুল ইসলাম শফিক জানান, পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে। বর্তমানে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হবে। অল্প সময়ের মধ্যে মামলার বিচার কাজ শুরু হবে।
তবে পেট্রোল বোমা হামলা মামলার দ্রুত বিচার কাজ শুরু করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে সরকার সর্বোচ্চ শাস্তির নিশ্চিত করবে এমনটাই প্রত্যাশা নিহত ও আহতের স্বজনদের।
/এআর/