মৌলভীবাজারে জঙ্গি আস্তানায় নিহত সোহেল রানা ওরফে লোকমান হোসেনের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কথা পাঁচ থেকে ছয় বছর আগেই জানতেন তার স্বজনরা। তারা বলছেন, এ কারণেই লোকমানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন তারা। লোকমানের শ্বশুর বাড়ির লোকজন বলছেন, চার বছর হলো মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে তাদের কোনও যোগাযোগ নেই। লোকমানের গ্রামের বাড়ি ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও (ওসি) বলছেন, লোকমানের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি জানা ছিল তাদেরও। তাকে ধরার জন্য পুলিশ অভিযানও চালিয়েছে।
গত বুধবার (২৯ মার্চ) মৌলভীবাজারের নাসিরপুর গ্রামে জঙ্গি আস্তানায় ‘অপারেশন হিট ব্যাক’ শুরু হলে আত্মঘাতী হয় সোহেল রানাসহ তার পরিবারের সদস্যরা। পরে জানা যায়, সোহেল রানার প্রকৃত নাম লোকমান (৪৫)। তার পরিচয় প্রকাশ হওয়ার পর স্বজনরা জানান, লোকমান ও তার স্ত্রী শিরিনা আক্তারের (৩৫) বাড়ি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে। অপারেশন হিট ব্যাকে এই দম্পতির সঙ্গে তাদের সন্তান আমেনা খাতুন (১২), সুমাইয়া আক্তার (৯), ফাতেমা (৫) ও মরিয়মও (সাড়ে ৩ বছর) মারা গেছে। লোকমান-শিরিনা দম্পতির খাদিজা নামে ৬ মাস বয়সী এক শিশু কন্যাও ছিল বলে জানান স্বজনরা। তবে ওই শিশু জীবিত নাকি মৃত, তা জানা যায়নি এখন পর্যন্ত।
লোকমানের নিহত হওয়ার খবর পেয়ে তার বাবা নুরুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। লোকমানের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তারা তিন ভাই। এক ভাই প্রতিবন্ধী, এক ভাই ঢাকার একটি গার্মেন্টে কাজ করেন। লোকমান কৃষ্ণরাম এলাকার দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করেছে। সে নানা ধরনের কাজ করেছে এলাকায় থাকাকালে।
লোকমানের বোন নুরজাহান বলেন, ‘লোকমানের লাশ আনা হবে কিনা সেটা এখনও বলতে পারছি না। বাবা অসুস্থ, এক ভাই ঢাকা, আরেক ভাই প্রতিবন্ধী। তাই এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’
লোকমানের আরেক বোন নুর বানু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লোকমানের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আমরা ৫/৬ বছর আগেই জানতে পারি। এরপর ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। ওর ভাগের জমি ও সম্পত্তি বণ্টন করে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক ছিল না। এখন লাশ নিয়ে এসে কোনও সমস্যায় পড়ব কিনা, তা নিয়ে নিয়ে চিন্তায় আছি।’
এদিকে লোকমানের শ্বশুর বাড়িতে যোগাযোগ করে জানা গেছে, তার স্ত্রী শিরিনার তিন বোন রয়েছে, কোনও ভাই নেই। ২০০২ সালে তাদের বিয়ে হয়। শিরিনা আক্তার স্থানীয় কলাবাড়ী দাখিল মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে।
লোকমানের শ্বশুর আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘৫/৬ বছর আগে লোকমানের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা ও ইসলামের অপব্যাখার কথা জানতে পারি। এরপর ওকে ওই পথ থেকে ফিরে আনতে চাপ দেই। কিন্তু লোকমান কথা না মানায় আমি মেয়ে-নাতনিদের বাড়ি নিয়ে আসি। পরে লোকমান ওই পথ থেকে ফিরে আসার কথা দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের বাড়িতে নিয়ে যায়। এরপর চার বছর ধরে মেয়ে ও নাতনিদের সঙ্গে আমাদের কোনও যোগাযোগ নেই।’
আবু বকর সিদ্দিক আরও বলেন, ‘গত ২৯ মার্চ রাতে আমার মোবাইলে ফোন করে নাতনি আমেনা খাতুন। কেঁদে কেঁদে বলে, আর দেখা হবে না। এরপর কথা হয় শিরিনা আক্তারের সঙ্গেও। সেও একই কথা জানায়। জীবনে কোনও অপরাধ বা বেয়াদবি করলে ক্ষমা করে দিতে বলে।’ তিনি বলেন, ‘জঙ্গিদের সঙ্গে যারাই সংশ্লিষ্ট থাকুক না কেন, তাদের সবাইকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া উচিত। প্রশাসন এটা করলে আর আমার মেয়ে-নাতনিদের জীবন দিতে হতো না।’
ঘোড়াঘাট থানার ওসি ইসরাইল হোসেন বলেন, ‘লোকমানের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কথা আমরাও জানতাম। তার বিরুদ্ধে মামলা ছিল। তাকে ধরার জন্য অভিযানও হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, পরিবার চাইলে লাশগুলো নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনও পরিবারই লাশ নিয়ে আসার বিষয়ে তাদের জানায়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, আগেও এই এলাকার অনেকেই জঙ্গিদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাই সন্তানদের নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তারা।
/জেবি/টিআর/
আরও পড়তে পারেন: হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জিকে গউছ আবারও বরখাস্ত