রমেকে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে চারটি লাশ, তিনটি বেওয়ারিশ

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল



রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে চারটি লাশ। তার মধ্যে তিনটি লাশই বেয়ারিশ। এরমধ্যে একটি নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার বামনিয়া এলাকার অক্ষয় কুমারের মেয়ে নীপা রানীর। এতো দিনেও বেওয়ারিশ লাশগুলো দাফনের কোনও ব্যবস্থা নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে লাশ ঘরের সবগুলো ফ্রিজ নষ্ট থাকায় লাশগুলো কংকাল হয়ে গেছে। দেখে চেনার কোনও উপায় নেই কোনটা কার কার লাশ।

ওয়ার্ড মাস্টার মাহমুদ হোসেন জানান, নীপার লাশ চার বছর ধরে আর বেওয়ারিশ তিনটি লাশ দুই বছরের বেশি সময় ধরে আছে। তবে নীপার লাশ নিয়ে মামলা চলায় এবং বাকি লাশগুলো স্বজনরা এসে যাতে সনাক্ত করতে পারে এ কারণে রাখা হয়েছিল।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, নীপা রানীর পাশ্ববর্তী বোরাগাড়ি গ্রামের জহুরুল ইসলামের ছেলে হুমায়ুন কবীর রাজুর সঙ্গে প্রেম ছিল। ২০১৩ সালে নীপা রানী তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে নীলফামারী শহরে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে করে। পরে তারা বিয়ে করেন। এ বিয়ের বিষয়টি মেনে নেননি নীপার বাবা অক্ষয় কুমার। তিনি এ ঘটনায় অপহরণ মামলা করেন। পুলিশ রাজুকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠালে তিনি জোর করে নীপা রানীকে বাড়িতে নিয়ে যান। এর কিছুদিন পর রাজু জামিনে মুক্তি পায়। এরমধ্যে নীপা বিষ পাণ করে আত্মহত্যা করেন। এরপর থেকে তার লাশ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আছে। অন্যদিকে প্রেমিকার মৃত্যুর খবর শুনে ৫৩ দিনের মাথায় রাজুও বিষ পাণ করে আত্মহত্যা করে। এর পর নীপা লাশ নিয়ে শুরু হয় দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব। নীপা রানীর বাবা অক্ষয় কুমার তার মেয়ের লাশ দাবি করে আদালতে মামলা করেন। অন্যদিকে তার স্বামী রাজুর বাবা জহুরুল ইসলামও পুত্র বধূর লাশ দাবি করেন। এ মামলা এখন হাইকোর্টে বিচারাধীন আছে। ফলে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত লাশ কার জিম্মায় দেওয়া হবে তা নির্ধারন করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার মাহমুদ হাসান।

তিনি বলেন, ‘নীপার বাবা ও রাজুর বাবা দুজনেই লাশ দাবি করছেন। আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া কাউকেই লাশ দেওয়া যাবে না। এদিকে ডেড হাউজের সবগুলো ফ্রিজ নষ্ট থাকায় লাশগুলো কংকাল হয়ে গেছে। এখন লাশগুলো সনাক্ত করার উপায় নেই।’

 

সরজমিন অনুসন্ধান করে দেখা গেছে ৩টি বেওয়ারিশ লাশের মধ্যে এক জন নারী ও দুই জন পুরুষ। এর মধ্যে গত ৩০ এপ্রিল ২০১৫ সালে এক ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হয়। ৩ মে ২০১৫ ইং তারিখে তিনি মারা যান। ওই ব্যক্তির কোনও নাম ঠিকানা না থাকায় হাসপাতালের ডেড হাউজে তার লাশ রেখে দেয় হাসপাতাল কতৃপক্ষ। ২০১৫ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর এক নারী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার লাশও বেওয়ারিশ হিসেবে ডেড হাউজে রেখে দেয় হাসপাতাল কতৃপক্ষ। অন্য লাশটি কবে থেকে ডেড হাউজে পড়ে আছে তার দিন তারিখ সাল কিছুই বলতে পারেনি হাসপাতালের ওয়াড মাস্টারসহ সর্দ্দার অফিস।

এ ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের আহ্বায়ক ও আইনজীবী এম এ বাশার বলেন, দুই বছর ধরে কেন ৩টি বেওয়ারিশ লাশ হাসপাতালে পড়ে আছে। এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। অবিলম্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

রংপুরের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে দায়িদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

প্রশাসন, পুলিশ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে কিনা এ ব্যাপারে ওয়ার্ড মাস্টার মাহমুদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনও সদুত্তোর দিতে পারেননি।

পরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মউদুদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ মাসেই এখানে যোগদান করেছেন। লাশগুলো কেন দীর্ঘ দিন ধরে পড়ে আছে সে ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না।কাগজ পত্র দেখে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

/জেবি/

আরও পড়তে পারেন: বিজয়নগরে গৃহবধূকে গলাটিপে ও পিটিয়ে হত্যা, আড়াই মাসেও অধরা আসামিরা