উজানের ঢল ও বৃষ্টির কারণে প্রতিদিনে হু হু করে বাড়ছে নদ-নদীর পানি। এতে গাইবান্ধার সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। চার উপজেলার ২৬ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের পানিবন্দি হয়ে লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। কর্মহীন এসব মানুষ খেয়ে না খেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
পানির প্রবল চাপে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ফুলছড়ি উপজেলার সিংড়া-রতনপুরসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যে কোনও সময় বাঁধ ভেঙে নতুন করে আরও এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে স্থানীয়রা।
পানিবন্দি লোকজন জ্বর, সর্দি ও ডায়রিয়াসহ নানা ধরনের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় বেশকিছু মেডিক্যাল টিম কাজ শুরু করেছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী মাহাবুবুর রহমান জানান, বুধবার সকাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদের পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে ৫৫ সে.মি ও ঘাঘট নদীর গাইবান্ধা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২৪ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানিও বুধবার সকালে বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে যে কোনও তিস্তা-করতোয়া নদীর পানিও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হবে।
গত ছয়দিন ধরে পানিবন্দি লাখো মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে গবাদি পশুর গোখাদ্যে সংকটসহ হাঁস-মুরগি নিয়েও চরম বিপাকে পড়েছে বন্যাদুর্গতরা। শতশত বিঘার পাট, আমন বীজ তলা ও ফসলি জমি তালিয়ে যাওয়া তা পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা।
এছাড়া চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের পানিবৃদ্ধি হওয়ায় ইতোমধ্যে অন্তত ৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আরও ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ ও পাঠদান ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে।
তবে মঙ্গলবার বিকালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফুলছড়ি উপজেলার কুচখালী চরের পানিবন্দি ৩০০ মানুষের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে চাল ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়। এছাড়া বুধবার সকাল পর্যন্ত নতুন করে কোথাও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের ত্রাণ বিতরণ তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। এছাড়া বন্যাদুর্গত এলাকার এখন পর্যন্ত কোথাও আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়নি।
চার উপজেলার ২৬ ইউনিয়নের পানিবন্দি লাখো মানুষের মধ্যে অনেকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন। প্রতিদিনে শতশত মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে রেলের জায়গা,বাঁধ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন।
উদাখালী ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন,‘পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন নতুন এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এছাড়া নদী ভাঙনসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের সিংড়া-রতনপুরসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এভাবে পানি বাড়লে যে কোনও সময় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে আরও হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি, আবাদি জমি, পুকুর ও রাস্তাঘাট তলিয়ে যাবে।
উড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মহাতাব উদ্দিন বলেন,‘বন্যার কারণে প্রতিদিনি তার ইউনিয়নে পানিবন্দির মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পানিবন্দি মানুষের মধ্যে খাদ্য, পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকে পানিবাহিত রোগেও ভুগছেন। সরকারিভাবে পানিবন্দি মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। আজ-কালের মধ্যে বন্যাদূর্গতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হবে।’
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল বলেন,‘চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা শুরু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা ও নগদ অর্থও বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি আশ্রয়ণ কেন্দ্র খুলে বন্যা দুর্গতদের নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুবুর রহমান জানান, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এসব নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলার কাজ চলছে।
/এসটি/