বিজিবির নায়েক সুমন হত্যা মামলা: সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানসহ দুজনের জামিন

ল্যান্স নায়েক সুমন মিয়াবিজিবির ল্যান্স নায়েক সুমন মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় বিজিবির দায়ের করা হত্যা মামলায় দহগ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানসহ দুজনের জামিন দিয়েছেন আদালত। তারা হলেন- সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও দহগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান ও একই ইউনিয়নের ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান হবি। এ মামলায় অপর ৫ জন আসামি লালমনিরহাট কারাগারে আটক থাকলেও ১০ জন আসামি এখনও পলাতক রয়েছেন।

বুধবার সকালে (২ আগস্ট) পাটগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অবনী শংকর এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘৩১ জুলাই হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরি ও এএনএম বাশির উল্লাহ এই জামিন মঞ্জুর করেন।’
পাটগ্রাম থানা পুলিশ, বিজিবি ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ২৬ জুন ঈদুল ফিতরের দিনগত রাত আড়াইটার দিকে দহগ্রাম ক্যাম্পের হাবিলদার আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি টহল দল তিস্তা নদীর আবুলের চর নামকস্থানে গরু চোরাচালান প্রতিরোধ করতে যায়। এক পর্যায়ে গরু ধরতে টহল দলের ল্যান্স নায়েক টুটুল মিয়া নদীতে নামেন। টুটুলকে বাঁচাতে রাইফেল, গুলি, জুতা ও মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য জিনিসপত্র টহল দলের সদস্য সিপাহী উচ্চ প্রু মারমার কাছে দিয়ে ল্যান্স নায়েক সুমন তিস্তায় নামেন। টুটুল কিনারে উঠতে পারলেও প্রবল স্রোতের কারণে সুমন নিখোঁজ হন।

তাৎক্ষণিক লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পাটগ্রাম কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার শেখ সুজাউল ইসলাম বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে রাতেই ভারতীয় বিএসএফের সহযোগিতায় নিখোঁজ সুমনকে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা হয়। ২৭ জুন সকালে রংপুর ও পাটগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের ৮ সদস্যের একটি ডুবুরি দল বিজিবি ও বিএসএফের সহযোগিতায় চিরুনি অভিযান চালিয়েও তাকে উদ্ধার করতে পারেনি। পরদিন ২৮ জুন ঘটনাস্থল আবুলের চর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার ভাটিতে তিস্তাপস্থি নামকস্থানে নিখোঁজ সুমনের মরদেহ উদ্ধার করে বিএসএফ।

ওইদিন বিকালে তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় বিজিবির কাছে বিএসএফ ল্যান্স নায়েক সুমনের মরদেহ হস্তান্তর করেন। দহগ্রাম পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) আবু হানিফ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সুমনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। একইদিন (২৮ জুন) পাটগ্রাম থানায় একটি মামলা করেন বিজিবির নায়েক আব্দুল ওয়াহেদ শেখ। পানিতে ডুবেই নিহত হয়েছেন বলে ওই মামলায় উল্লেখ করা হয়।

সুমনকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে আগের মামলার ১০ দিন পর গত ৮ জুলাই পাটগ্রাম থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে দ্বিতীয় মামলাটি দায়ের করেন আব্দুল ওয়াহেদ শেখ। এ মামলা করার আগে সুমনের মৃত্যুর ঘটনায় দহগ্রামের ১৭ জন নাগরিককে আটক করে রংপুরে নিয়ে যায় বিজিবি। দহগ্রামে গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে পুরুষশূন্য গ্রামটি।

বিষয়টি জানতে পেয়ে স্থানীয় সাংসদ সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন ৬ জুলাই ঘটনার বিবরণ জানতে দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে এক মতবিনিময় করেন। ওই সভায় দহগ্রামের আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে বিজিবিকে সতর্ক করে আটক ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে বা পুলিশের নিকট সোপর্দের নির্দেশ দেন।

এমপির নির্দেশের দুদিন পর ৮ জুলাই দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানসহ ১৭ জনের নামে বিজিবি হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় বিজিবির কাছে আটকদের মধ্যে ৫ জনকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।

দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার তহিদুল হক ও বিজিবির সোর্স তৈজুল হক ওরফে নুরু বিডিআর এখন পর্যন্ত বিজিবি হেফাজতে আছে। দহগ্রামের স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম নুরুল হাসানসহ কয়েকজনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও কয়েকজনকে অন্য একটি মামলায় পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিবির এক কর্মকর্তা জানান, বিজিবির সোর্স তৈজুল হক (নুরু বিডিআর) বিজিবির হেফাজতে থাকার সত্যতা নিশ্চিত করেন। কিন্তু দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার তহিদুল হক তিস্তা নদীতে নেমে পালিয়ে গেছেন। এ ধরনের একটি ভিডিও চিত্র দেখিয়ে তা নিশ্চিত করা হয়। ২৬ জুন বিজিবির টহল দলে এই দুই ব্যক্তি সঙ্গে ছিলেন।

লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল গোলাম মোর্শেদ কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দহগ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, ‘স্থানীয় আওয়ামী লীগের গ্রুপিং এবং ইউপি নির্বাচনি দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে একটি মহল মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। ফলে আমাকেসহ স্থানীয় লোকজনকে হয়রানি করতেই ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় আসামি করা হয়েছে। আদালতে আইনি লড়াই করে আমরা নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করবো।’

সুমন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পাটগ্রাম থানার ইন্সপেক্টর(তদন্ত) ফিরোজ কবির বলেন, ‘গুরুত্ব দিয়ে মামলার তদন্ত চলছে। একই ঘটনায় পৃথক পৃথক বক্তব্য দিয়ে বিজিবি দুটি মামলা করায় স্থানীয়দের মধ্যে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য তদন্ত কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে।’ তবে কবে নাগাদ আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে পারবেন তা তিনি নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি তিনি।

/এআর/