ঢোল তৈরিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন কারিগররা

নীলফামারীনীলফামারীতে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মালম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এই পূজার আরতিতে এবং মন্ত্রপাঠের সময় ঢোল ও ঢাকের বিকল্প নেই। অথচ কাঠের দাম, মজুরি, চাহিদা কমে যাওয়া এবং ইলেকট্রনিক্স বাদ্যযন্ত্রে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এ ঢোল তৈরিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন কারিগররা। 

সমাজ সেবা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারী সদরসহ ছয় উপজেলায় প্রায় ২৫০টি পরিবার ঢাক ও ঢোল তৈরির কাজে নিয়োজিত আছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া কাছাড়ী পাড়া গ্রামে ও রামনগর বাসার বাড়ী বেহারা পাড়া গ্রামে ৫০টি পরিবার ঢাক, ঢোল, দোতারা, ঢুগি, তবলা, খোল, খুনজনি ও একতারাসহ আরও অনেক ধরণের বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে থাকে।

এসব বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ঢাক, ঢোল ও খোল দেশের চাহিদা মিটিয়ে এক সময় পার্শবর্তী দেশ ভারত ও নেপালসহ বেশ কয়েকটি দেশে রফতানি হতো। সীমান্তবর্তী নীলফামারী জেলার অবস্থান হওয়ায় ভারতে এসব বাদ্যযন্ত্রের কদর বেশি।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঢোল তৈরিতে কারিগররা দেশীয় আম, জাম, রেইনট্রি কড়াই ও মেহগিনি কাঠসহ ঢাকের ছাউনির জন্য ছাগল ও ভেড়ার চামড়া এবং বেড়ী দেওয়ার জন্য মহিষের চামড়া ব্যবহার করছেন। এবারে চামড়ার দাম সহনীয় পর্যায় থাকলেও কাঠের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এ শিল্পের কারিগররা।

নীলফামারি-২৩২৩২৩জেলা শহরের গাছবাড়ী এলাকার ঢোলের কারিগর সাগর চন্দ্র দাস বলেন, ‘এটা আমার পৈত্রিক পেশা। আমি এ পেশায় ২৫ বছর ধরে কাজ করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে একটি ঢোল বিক্রি হত ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায়। এখন এই ঢোল বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়। তাই সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

নীলফামারী সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া (কাছাড়ী বাজার) গ্রামের সুবাস ঋষি বলেন, ‘এক সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাজের অর্ডার আসতো। কিন্ত  এখন আর তেমন কাজের অর্ডার আসে না। এখন দুর্গাপূজার জন্য কিছু কাজ পেয়েছি।’

একই এলাকার দিলীপ আবদাল (৪৪) বলেন, ‘এ পেশার লোকজন সংখ্যায় কম হওয়ায় আমাদের দিকে কেউ নজর দেয় না। শুধু দুর্গাপূজার সময় কাজের চাহিদা থাকলেও সারাবছর বেকার থাকতে হয়। অর্থের অভাবে অনেকেই মালামাল কিনতে না পেরে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। তাছাড়া ইলেকট্রেনিক বাদ্যযন্ত্রে চাহিদা বেড়ে গেছে।’

শহরের হাড়োয়া দুর্গা মন্দিরের পুরোহিত মহেষ চন্দ্র রায় বলেন,‘ঢাকের বাজনা ছাড়া মন্ত্র পাঠ শুদ্ধি হবে না।’ তিনি আরও বলেন,‘ঢাকের বোলে জগৎ জননী মায়ের পূজা আনন্দময় হয়ে উঠে। দুর্গতি নাশিনি দুর্গাদেবি বছরে একবার পৃথিবীতে (বাবার বাড়ী) আসেন শান্তির বাণী নিয়ে। তাই পূজায় ষোল কলা পূর্ণ করতে ঢাক বা ঢোলের বিকল্প নেই।’

ওই মন্দিরের আরতির ঢাকুয়ার (ঢোল বাদক) হৃদয় ঋষি (৩৭) বলেন, ‘জিনিশ পত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই প্লাস্টিকের তৈরি অথবা টিনের ড্রামের মধ্যে ছাউনি দিয়ে পূজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে পুরনো দিনের এসব ঢাক, ঢোল, খোল,ডুগি, তবলা।’ 

নীলফামারী স্বরনালী সুর সঙ্গীত একাডেমির সভাপতি ফেরদৌস আলম বলেন, ‘আধুনিকতার ছোঁয়ায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্র এখন বিলুপ্তির পথে।’

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) নীলফামারীর নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী ফারুগ ভুঁইয়া বলেন, ‘আজকাল আর মাটিয়া গান, পালাগান ও যাত্রাগান গ্রামেগঞ্জে মঞ্চায়ণ হয় না।’ তিনি আরও বলেন,‘আগে ঢোল, ঢুগি,তবলা, দোতরা, হারমোনিয়াম ছাড়া গানের আসরই জমতো না। কিন্তু এখন সেখানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় স্থান পেয়েছে ড্রাম ও গিটারসহ অন্যান্য উন্নত বাদ্যযন্ত্র। যা দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।‘

জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আল-মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ওই ২৫০ পরিবারের কথা জানানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত ঢোলের কারিগরদের সমস্যা সমাধান করা হবে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো, খালেদ রহীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ জেলায় প্রাচীন যুগের ঢোল, খোল, তবলা ও একতারাসহ বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে প্রায় ২৫০ পরিবার। এখন এ শিল্পটি বিলুপ্তির পথে।’