ঠাকুরপাড়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ঘর নির্মাণ শুরু

তাণ্ডবের পর ঠাকুরপাড়া

রংপুরে সদর উপজেলার পাগলাপীর ঠাকুরপাড়া গ্রামে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ পরিবারের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে নতুন টিন ও বাঁশের খুটি দিয়ে ঘরগুলো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। রবিবার বিকালের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান।

ফেসবুকে বিতর্কিত একটি স্ট্যাটাসের অভিযোগ তুলে শুক্রবার ঠাকুরপাড়ায় হামলা চালানো হয়। পুলিশ জানায়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর আশেপাশের ৬-৭টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ ঠাকুরপাড়া গ্রামে হামলা চালায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি চালালে ছয় জন আহত হন। পরে আহতদের একজন মারা যান।

ওইদিন ঠাকুরপাড়ার অন্তত ৩০টি বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, ভাঙচুর করা হয় ২০টি বাড়ি। হামলাকারীরা বাড়িঘরের মালামাল, বাসনপত্র, গরু-ছাগলও লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রামবাসী।  

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর ঠাকুরপাড়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পাশেই একটি স্কুলে থাকার ব্যবস্থা করা হলেও বিভিন্ন কারণে তারা সেখানে যাননি। তারা দ্বিতীয় দিনের মতো খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অভিযোগ, তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া ছাড়াও মালামাল, গরু-ছাগল ও টাকাসহ সব কিছু লুট করে নিয়েছে সন্ত্রাসীরা। শুধু ঘর তৈরি করে দিলে তো তাদের সমস্যার সমাধান হবে না।

ক্ষতিগ্রস্ত মসনি বালা জানান, ‘তার ৩টি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মালপত্র সব লুট করে নিয়ে গেছে। বাড়িতে আধা মনের মতো চাল ছিল তাও পুড়ে গেছে। কাথা, বালিশ, চাদর ও চৌকিসহ সব কিছু পুড়ে গেছে। ২টি গরু একটি ছাগল ছিল তাও নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। ঘর তৈরির পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করলে পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।’

একই কথা নরেন চন্দ্রেরও। তিনি জানান, তার দুটি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুটি ছাগল ছিল তাও লুট করে নিয়ে গেছে। বাড়িতে আগুন দেওয়ার কারণে ঘরে থাকা কোনও মালামাল রক্ষা করতে পারেননি। এমন অবস্থায় ঘর তৈরি করে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

সরেজমিন ঠাকুরপাড়া গ্রাম ঘুরে ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা সবাই সহায় সম্বলহীন। তাদের বেশিরভাগই মজুরেরসহ বিভিন্ন ছোট ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। তাদের দাবি স্থায়ী পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করা হোক।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি মেম্বার অনিল চন্দ্র বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন করে ঘরবাড়ি তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। আজই (রবিবার) ঘর তৈরির কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। এরইমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে  উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবার পিছু তিন হাজার টাকা করে এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে। এই পরিবারগুলোকে স্থায়ীভাবে পুর্নবাসনের জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান রবিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘর নির্মাণে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন। এসময় তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য যা যা করা দরকার সবই করা হবে।

অন্যদিকে, ঠাকুরপাড়া হিন্দু পাড়ায় তাণ্ডবের ঘটনায় রংপুর সদর ও গঙ্গাচড়া থানার পুলিশ বাদী হয়ে রংপুর জেলা জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সভাপতি এনামুল হক মাজেদী ও বিএনপি নেতা মাসুদ রানাসহ কয়েকজন জামায়াত নেতাকে প্রধান আসামি করে কয়েক হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত মামলার প্রধান আসামিদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের প্রত্যেকের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে আছে। আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

আরও পড়ুন: ফেসবুকে কথিত স্ট্যাটাস দেওয়া টিটু রায় ‘নিরক্ষর’, এলাকায় নেই ৭ বছর