ভোটার হতে চান নীলফামারীর বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা

নিলফামারীতে বিলুপ্ত ছিটমহলের কয়েকজন পর হচ্ছেন খালআজ পহেলা আগস্ট, দেশের উত্তরের সীমান্তবর্তী চার জেলার সিট মহল বিলুপ্তির চার বছর পূর্ণ হলো। ছিট মহল বিলুপ্তির পর সেখানকার বাসিন্দাদের অনেক চাহিদা পূরণ করা হলেও এখনও অনেক প্রয়োজন অধরাই রয়ে গেছে। এই যেমন নীলফামারীর বিলুপ্ত চার ছিটমহলের মানুষের স্বপ্ন কবে তরা ভোটার হবেন। আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তারা। এছাড়া রাস্তাঘাট, ব্রিজ নির্মাণসহ সেখানকার সংকটগুলোর তাড়াতাড়ি সমাধান চান নিলফামারীর বিলুপ্ত ছিট মহলের বাসিন্দারা।

ছিটমহলের পাশে গয়াবাড়ি, খগাখড়িবাড়ি ও টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের সীমানা নির্ধারণের দ্বন্দের মামলায় থেমে আছে এসব এলাকার নাগরিকদের ভোটার তালিকা তৈরির কাজ। তাদের সকলের দাবি আগামী সংসদ নির্বাচনের আগেই সমস্যা সমাধান করে এসব নাগরিককে ভোটার করার।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল নগর জিগাবাড়ি গ্রামের জহির উদ্দিন (৫৫) বলেন, ‘৬৮ বছরের বন্দি দশা থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশের নাগরিক হতে পেরে ভালই লাগে। তবে ভোটার কবে হবো সেটা নিয়ে জল্পনা কল্পনা সবার মাঝে রয়েছে।

একই এলাকার মাহাবুল ইসলাম বলেন, ‘বিলুপ্ত ছিটমহল নগর জিগাবাড়ি গ্রামটিকে বিভক্ত করেছে কুমলাই নদী। ওই নদীর পূর্ব পাশদিয়ে নির্মিত হয়েছে পাকা সড়ক। কিন্তু নদী পারাপারের সেতু না থাকায় পশ্চিম প্রান্তের মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।’

বিলুপ্ত ছিটমহল এলাকার রাস্তায় ভ্যান চালাচ্ছে একজন চালকবিলুপ্ত ছিটমহলের নাগরিক কমিটির সদস্য ফরিদুল ইসলাম বলেন,‘নদীর পশ্চিম প্রান্তে গ্রামের ৪০ পরিবারের বসবাস। এছাড়াও ছোট খানকি ও বড়খানকি গ্রাম। নানা প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হলেই কুমলাই নদী পার হতে ওই এলাকার মানুষকে। বিশেষ করে শিশুদের স্কুলে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এছাড়া বাকি তিন ছিটমহল ওই পথেই চলাচল করতে হয়।’

যোগাযোগ ব্যবস্থা অপূর্ণ থাকার পাশাপাশি এসব নাগরিকের অনেক চাওয়া পাওয়া এখনো অধরা। এবিষয়ে জিগাবাড়ি গ্রামের সাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হামেরা নাগরিক হইনো, কিন্তু একবারো ভোট দিবার পারিনো না। হামার আবেদন এইবার সংসদ নির্বাচনোত যেন ভোট দিবার পারি।’

বিলুপ্ত ছিটমহল ২৯ নম্বর বড়খানকি খারিজা গিদালদহ গ্রামের আবদার রহমান (৭১) বলেন, ‘সরকারি ইলিপ পাইছি, টিবোল (টিউবওয়েল) পায়খানা (ল্যাট্রিন) পাইছি, জমির কাগজ পাইছি, কিন্তু হামার গ্রামোত আস্তাটা (রাস্তা) এলাও হয় নাই।’ তিনি বলেন, ‘স্কুল হইবে, মসজিদ, ডাক্তারখানা (চিকিৎসা কেন্দ্র) হইবে, কিন্তু এইলার কিছুই হয়নাই।বাড়ির ছাওয়ালা এলাও কষ্ট করি দুরের স্কুলোত পড়িবা যায়।’ ২৯ নম্বর গ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের (৭০)ও লাইলী বেগম (৫৬) বলেন, ‘গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের জোর দাবি জানায়।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ডিমলা উপজেলার বিলুপ্ত চার ছিটমহল ২৮ নম্বর বড়খানকি কান্দাপাড়া, ২৯ নম্বর বড়খানকি খারিজা গিদালদহ, ৩০ নম্বর বড়খানকি গীদালদহ, ৩১ নম্বর নগর জিগাবাড়ি ছিটমহল ঘুরে দেখা গেছে উন্নয়নের চিত্র। এসব গ্রামের ১৫৭ পরিবার পেয়েছে বিদ্যুৎ সুবিধা। অনেকের বাড়িতে দেখা গেছে বিদ্যুৎ চালিত বিভিন্ন সামগ্রী। অধিকাংশ বাড়িতে স্থাপিত হয়েছে নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। ওই চার ছিটমহলের জন্য এলাকার রহমানের বাজারে স্থাপিত হয়েছে ডিজিটাল তথ্য সেবা কেন্দ্র। ওই চার গ্রামের মধ্যস্থল নগর জিগাবাড়িতে নির্মিত হয়েছে কমিউনিটি সেন্টার। তবে ২৯ নম্বর বড়খানকি খারিজা গিদালদহ গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার তেমন উন্নয়ন হয়নি। নগর জিগাবাড়ি গ্রামে কুমলাই নদীর সেতুর অভাবে কোলে করে শিশু শিক্ষার্থীদের নদী পার করাতে দেখা গেছে অভিভাবকদের।

বিলুপ্ত ছিটমহল এলাকায় নবনির্মীত ভবনসূত্র জানায়, বিলুপ্ত চার ছিটমহলে প্রথম বছর শতভাগ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য নলকূপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিলুপ্ত ছিটমহল ৩১ নম্বর জিগাবাড়ির মতির বাজার হতে কালির ডাঙ্গা পর্যন্ত তিন দশমিক ২০ কিলোমিটার সড়ক এক কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে এবং উত্তর গয়াবাড়ী হতে গয়াবাড়ী পর্যন্ত এক কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এক দশমিক ১৪০ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপির) অর্থায়নে ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর বিলুপ্ত ছিটমহলে ৪৯টি নলকূপ, ৭৬টি পাকা টয়লেট ও ৩১ নম্বর বিলুপ্ত ছিটমহলে ৫৪টি নলকূপ ও ৩০টি পাকা টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, পানি নিঃষ্কাশনের জন্য মতির বাজার হতে শুকুর আলীর বাড়ী সংলগ্ন এলাকায় ইউড্রেন নির্মাণ হয়েছে। মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উদ্দ্যোগে ২৬টি সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। প্রাণীসম্পদ বিভাগ, যুব উন্নয়ন, সমবায় বিভাগ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। ৬১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ব্যয়ে নগর জিগাবাড়ি গ্রামে কমিউনিট সেন্টার নির্মিত হয়েছে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. নাজমুন নাহার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘জমির মালিকরা জায়গা ছেড়ে না দেওয়ার কারণে কিছু রাস্তার কাজ করা সম্ভব হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘এসব বিলুপ্ত ছিটমহলে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের নিকট প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।’

উল্লেখ্য, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বিলুপ্ত চারটি ছিটমহলে ১৬৮ দশমিক ৪৮ একর এলাকায় ১৫৭ পরিবারের বসবাস। ওই চার ছিটমহলের জনসংখ্যা ৬৪৫ জন। এসব ছিটমহলের পাশে অবস্থিত উপজেলার গয়াবাড়ি, খগাখড়িবাড়ি ও টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন। ওই তিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের ভোটার বৃদ্ধি ও ইউনিয়নের আয়তন (সীমানা) বৃদ্ধির দ্বন্দ্বের শিকার সদ্য বিলুপ্ত চার সিটমহলের বাসিন্দারা। এ কারণে হাইকোর্টের রিটে ভোটার তালিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।