মামলার পর গ্রেফতার ও হয়রানির আতঙ্কে শুক্রবার (১২ অকেটাবর) সকাল থেকে দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন দোকানিরা। বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) দুপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতকালে ওই ঘটনা ঘটে।
শুক্রবার (১২ অক্টোবর) সকাল ও দুপুরের পর শহরের জিয়া বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। ক্রেতারা নিজেদের নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে দোকান বন্ধ পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বন্ধের দিন হওয়ায় বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে তাদের।
জিয়া বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও জিয়া বাজার ক্ষুদ্র বণিক সমিতির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবারের (১১ অক্টোবর) সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হওয়ার খবরে গ্রেফতার আতঙ্ক ও হযরানির ভয়ে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন।
বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা মাসুদ নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘সপ্তাহের শুক্রবার আমরা উৎসবের আমেজে বাজারে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে আসি। কিন্তু, আজ এসে দেখি সকাল থেকে বাজারের দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।’
বাবু নামে জিয়া বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, কাল পুলিশ ব্যবসায়ীদের পিটিয়েছিল। দেড়-দুইশ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ভয় আর আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা দোকান খোলেননি।
পুলিশের লাঠিপেটায় আহত বাজার ক্ষুদ্র বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শমসের আলী মোবাইলফোনে বলন, ‘আমি অসুস্থ হয়ে পড়ে আছি, বাজারে যাইনি। তবে, শুনেছি ব্যবসায়ীরা দোকানপাট খোলেনি। সম্ভবত মামলার খবরে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। পুলিশি হয়রানির ভয়ে দোকান খোলেননি।’
জিয়া বাজার ক্ষুদ্র বণিক সমিতির সভাপতি মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত, মামলা ও আটকদের জামিনের ব্যাপারে আমরা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আলী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছি। তিনি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’
সফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা আগামী সোম-মঙ্গলবার পর্যন্ত সমস্যা সমাধানের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবো। আটক ব্যবসায়ীদের জামিন ও মামলা প্রত্যাহার না হলে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো, আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে পারি।’
কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসি মো. মাহফুজার রহমান বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে দোকানপাট খোলা রেখে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলেছি। তাদেরকে আশ্বস্ত করেছি, অযথা কোনও ব্যবসায়ীকে হয়রানি করা হবে না। আশা করছি, তারা বিকাল থেকে বাজার সচল রাখবেন।’
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) বিকালে শহরের জিয়া বাজারে নীরব স্টোর ও মারিয়া স্টোর নামে দুটি মুদির দোকানে পণ্যে পাটের বস্তার পরিবর্তে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের দায়ে ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাতেমা খাতুন। এসময় বাজার কমিটির লোকজন ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা ভ্রাম্যমাণ আদলতের কার্যক্রমে বাধা দিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এর একপর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সদস্যদের ওপর ব্যবসায়ীদের লোকজন ঢিল ছুড়লে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশ লাঠিচার্জের পাশাপাশি শর্টগানের ৫ রাউন্ড বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে দুই পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে তিন জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে বৃহস্পতিবার রাতে পাট অধিদফতর কুড়িগ্রামের মুখ্য পরিদর্শক মো. আব্দুল কাদের সরকার বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখসহ আরও দেড়-দুশজন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের জুন মাসে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার বিধিমালা, ২০১৩’ সংশোধন করে নতুন করে আরও ১১টি পণ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে প্রজ্ঞাপন জারি করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। পণ্যগুলো হলো- পেঁয়াজ, আদা, রসুন, মরিচ, হলুদ, ধনে, ডাল, আলু, আটা, ময়দা ও তুষ-খুদ-কুঁড়া। সব মিলিয়ে মোট ১৭টি পণ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে সরকার।
আরও খবর: ভ্রাম্যমাণ আদালতকালে দোকানিদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ