ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে। জয়ের লক্ষ্যে ভোটারদের কাছে নিজেদের আবেদন পৌঁছাতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন। সমর্থকদের পাশাপাশি প্রচারে নেমেছেন মির্জা ফখরুল ইসলামের সহধর্মিণী ও কন্যা। অন্যদিকে রমেশের পক্ষে প্রচারে নেমেছেন, প্রয়াত এমপি খাদেমুল ইসলামের ছেলে শাহেদুল ইসলাম।
এক পক্ষ বলছেন, গাড়িবহরে হামলা, কর্মীদের অব্যাহত ধর-পাকড় আর নানা বাধার মধ্যেও স্বভাবসুলভ সহনশীল শালীন আর তথ্য ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম মানুষের কাছাকাছি চলে যেতে পেরেছেন। তিনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই উত্তাল জনস্রোত, আর ধানের শীষের জোয়ারে ভাসছে।
তবে রমেশ চন্দ্র সেন দাবি করেছেন, ‘নির্বাচনের মাঠে কান্নার কোনও জায়গা নেই, মূল প্রশ্ন উন্নয়ন। নৌকার পক্ষে গণজোয়ার এসেছে। নির্বাচনি এলাকার ৯০ শতাংশ ভোটার আমাকে সমর্থন করছে।’
নির্বাচনি আসনটি ঘিরে রয়েছে নানা বিতর্ক। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১ লাখ ২০ হাজার ভোট এককভাবে পাওয়ার আশা করছেন নৌকা মার্কার সমর্থকরা।
কিন্তু বিএনপির জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নারগুণ ইউনিয়নের চারবারের চেয়ারম্যান পয়গাম আলীর মতে, ঠাকুরগাঁওয়ের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির উদার মানুষ, শুধু পূজা-পার্বণে তাদের সঙ্গে কেবল অন্ন গ্রহণই নয়, ফখরুল ইসলামের ছেলেবেলার বন্ধুদের অনেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের। এছাড়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তৈমুর রহমানের নিজ বাড়ির দিকে এবং আমার এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই বিএনপিকে ভোট দেন। মন্দির ভাঙাসহ নানা চক্রান্ত করেও আওয়ামী লীগ বিএনপির জোয়ার ঠেকাতে পারেনি। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে রমেশ সেন মন্ত্রী থাকাকালীন এবং তার পরবর্তী সময়েও অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন, সেটা এখন ওপেনসিক্রেট।
তবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. তোজাম্মেল হক মঞ্জুর মতে, ‘বিএনপির নেতাকর্মীরা শিঙ্গিয়া শাহপাড়ার হিন্দু বাড়িতে আগুন দেওয়ার চিহ্নিত আসামি । তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনি সহিংসতায়ও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা করেছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ১ লাখ ২০ হাজার ভোট আশা করবার তাদের মুখ নেই। দেশের অনেক জায়গার মতো এখানেও দুই একজন গয়েশ্বর রায় থাকতেই পারে। তবে তিনি ৯০ শতাংশ মনে না করলেও আওয়ামী লীগের জয়লাভের ব্যাপারে আশাবাদী।’
বিতর্ক হচ্ছে, এ আসনে বেশিরভাগ সময় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যানে বিএনপির তথা তাদের মহাসচিবের অতীত রেকর্ডটি ভালো নয়। চারবারের নির্বাচনে তার বিজয় মাত্র একবার, ২০০১ সালে। আবার ২০০৮ সালেই তিনি রমেশ সেনের কাছে পরাজিত হন।
তবে স্থানীয় রাজনীতিবিদরা বলছেন, মনোনয়নের সময়ে রমেশ সেনের প্রার্থিতা সত্ত্বেও ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ১৩ জন আওয়ামী লীগ নেতা মনোনয়ন চান। এতে দলে রমেশ সেনের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন আসে। দল কতটা ঐক্যবদ্ধ সে প্রশ্নও আসে। মনোনয়ন পাওয়ার সময়ই তার দলের প্রতিদ্বন্দ্বীরা জানান, তার বয়স হয়ে গেছে, এবং তৃণমূলে দাবি আছে তরুণ নেতৃত্ব আনার।
এছাড়া ২০১৪ সালে দলের জেলা সম্মেলনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি দবিরুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। এদিকটায় মির্জা ফখরুল ঝামেলামুক্ত। কখনোই তার নেতৃত্ব নিজ দলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি।
রমেশ সেন সংখ্যালঘু ভোটের বেশিটা পাবেন এটা ধরে নেওয়া যায়। তবে জামায়াত ও জাতীয় পার্টির যে ভোট ব্যাংক এখানে আছে তাতে একচেটিয়া ভোট পেলে মির্জা ফখরুলই এগিয়ে থাকবেন।
তবে আওয়ামী লীগ বলছে, এখন নৌকার পালেই হাওয়া, রমেশ সেন অনেক উন্নয়ন করেছেন।
ঠাকুরগাঁও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ বলেন, এখানে একটি আকর্ষণীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে আশা করা যায়। দুজন প্রার্থীই অত্যন্ত শক্তিশালী।
নির্বাচনি পরিসংখ্যান: ২০০৮ সালে নবম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেন নৌকা প্রতীক নিয়ে ৫৬ হাজার ৬৯০ ভোটের ব্যবধান ধানের শীষ প্রতীকের মির্জা ফখরুলকে পরাজিত করেন। নৌকা পায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ১০১ ভোট, ধানের শীষ পায় ১ লাখ ২০ হাজার ৪১১ ভোট। এর আগে ২০০১ সালে ৮ম সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৩৭ হাজার ৯৬২ ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেনকে হারান। ধানের শীষ পায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১০ ভোট আর নৌকা পায় ৯৬ হাজার ৯৪৮ ভোট। এককভাবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নূরে আলম চৌধুরী পান ১৬ হাজার ৬৪৭ ভোট।
১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নৌকা প্রতীক নিয়ে খাদেমুল ইসলাম পান ৫৭ হাজার ৫৩৫ ভোট, বিএনপির মির্জা ফখরুল ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পান ৩৬ হাজার ৪০৬ ভোট। ভোটের ব্যবধান ২১ হাজার ১২৯ ভোট।
তবে আলাদাভাবে নির্বাচন করে জামায়াত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম পান ২৬ হাজার ৮০০ ভোট আর জাতীয় প্রার্থীর প্রার্থী রেজওয়ানুল হক পান ২১ হাজার ৫০ ভোট।
জাতীয় নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মহাজোট ও জোটের শরিকদের ভোটারও এই আসনে বড় ফ্যাক্টর। তবে গত ২০ বছরের জাতীয় পার্টির ভোটার কমলেও বেড়েছে জামায়াতের ভোট। বর্তমানে ঠাকুরগাঁও সদর আসনটিতে জামায়াতের ৪৫ থেকে ৫০ হাজার ভোট রয়েছে। তবে হিন্দু ভোটারকে কাছে টানতে না পারলে আসনটি উদ্ধার করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বলে অভিমত স্থানীয় নেতাকর্মীদের।