দিনাজপুরের বাজারে অপরিপক্ব লিচু, স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা

দিনাজপুরের বাজারে অপরিপক্ব লিচুদিনাজপুরের বাজারে পুরোদমে আসতে শুরু করেছে মধুমাসের ফল লিচু। গত বছরের তুলনায় এবার দাম কম হলেও যেসব লিচু বাজারে উঠছে তার বেশিরভাগই অপরিপক্ব। কৃষক ও বাগান ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড তাপদাহে লিচুর রঙ ঝলসে যাচ্ছে। এজন্য লোকসানের আশঙ্কায় আগেভাগেই বাধ্য হয়ে এসব লিচু বাজারজাত করছেন তারা। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিপক্ব লিচু শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
দিনাজপুরের প্রধান লিচুর বাজার শহরের নিউমার্কেটে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে বেচাকেনা হচ্ছে লিচু। এসব লিচু যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাইরের জেলাগুলোতেও। বর্তমানে এই বাজারে প্রতি একশ’ মাদ্রাজি লিচু ১২০ থেকে ১৮০ টাকা, বোম্বাই লিচু ১২০ থেকে ২০০ টাকা, বেদেনা লিচু ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, চায়না-৩ লিচু ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে এই বাজারে যেসব লিচু উঠছে তার অধিকাংশই অপরিপক্ব। লিচুর যে প্রাকৃতিক রঙ, তা এখনও আসেনি।
লিচুচাষি নজরুল ইসলাম জানান, এবারে লিচুর ভালো রঙ আসেনি। তবে যে লিচু বাজারে উঠেছে তা সবই পাকা। গাছের ছায়া ও রোদ-বৃষ্টির ওপরে লিচুর রঙ নির্ভর করে।
ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম জানান, দিনাজপুরের লিচুর চাহিদা সবজায়গায় রয়েছে। এখান থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে লিচু পাঠানো হবে। তবে এবারের লিচু পরিপক্ব নয়। প্রচণ্ড তাপদাহে অনেক বাগানেই লিচুর রঙ ঝলসে যাচ্ছে। এজন্য চাষিরা আগেভাগেই বাজারে লিচু বিক্রি করতে নিয়ে এসেছেন।
কৃষক নয়ন ইসলাম জানান, অত্যাধিক গরম ও রোদে লিচু ঝলসে ও ফেটে যাচ্ছে। তাছাড়া ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কিছুদিন পরেই ঈদ। এই ঈদে অফিস, আদালত, বাজারঘাট বন্ধ থাকবে। তখন লিচু বাজারে নিয়ে আসলেও বিক্রি করা যাবে না। তাই আগেভাগেই লিচু বাজারে আনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
ক্রেতা সৌরভ অধিকারী জানান, এবার আগেভাগেই বাজারে লিচু পাওয়া যাচ্ছে। আগের বছরের চেয়ে এবার দামও কম।
02একই কথা জানান সিরাজগঞ্জ থেকে আসা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, দিনাজপুরে একটি কাজে এসেছিলাম। এই জেলার লিচুর বেশ সুনাম রয়েছে তাই বাড়ি ও আত্মীয়দের জন্য নিয়ে যাচ্ছি। দামও হাতের নাগালে। কম দাম থাকায় সবাই লিচু খাওয়ার সুযোগ পাবে বলে জানান তিনি।
দিনাজপুর কৃষি বিভাগের হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক প্রদীপ কুমার গুহ জানান, দিনাজপুরে বেশ কয়েক জাতের লিচু উৎপাদন হয়ে থাকে। এরমধ্যে মাদ্রাজি লিচু পরিপক্ব হয় মে মাসের শেষের দিকে, বোম্বে ও বেদেনা পরিপক্ব হয় জুন মাসের ১০ তারিখের পর এবং সবশেষে পরিপক্ব হয় চায়না-৩ লিচু।
তিনি আরও জানান, আবহাওয়ার কারণে এবার লিচুর ফুল আসতে দেরি হয়েছে। তাই এবার লিচু পরিপক্ব হতে আরও সময় লাগবে। কিন্তু ইতোমধ্যেই অপরিপক্ব লিচু বাজারে আনতে শুরু করেছেন বাগান মালিকরা।
প্রদীপ কুমার গুহ জানান, দিনাজপুর জেলায় এবার প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন। লিচু লাভজনক হওয়ায় দিনাজপুরে প্রতিবছর লিচুর বাগানের পরিমাণ বাড়ছে।
বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে প্রদীপ কুমার গুহ বলেন, ‘লিচু ভালো রাখতে এবং উৎপাদন বাড়াতে কীটনাশক ও ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু কিছু বাগান মালিক এর অপপ্রয়োগ করেন। এ বিষয়ে এবার বাগান মালিক ও লিচু ব্যবসায়ীদের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া সঠিক মাত্রা কীটনাশক ও ওষুধ প্রয়োগের জন্য বাগানে বাগানে মনিটরিং ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘লিচুতে অর্গানিক এসিড রয়েছে। অপুষ্ট শ্বাস ও অপরিপক্ব লিচুতে এর মাত্রা বেশি থাকে। এমন অবস্থায় লিচু খেলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে।’
দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরুজুল ইসলাম বলেন, ‘অপরিপক্ব লিচু কেউ যেন বাজারজাত করতে না পারে সেজন্য সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। এরপরও যদি কেউ আনে তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে লিচুতে যাতে করে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করা হয় সেই তদারকিও রয়েছে।’
লিচুতে মাত্রারিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক পদার্থের স্প্রের কারণে দিনাজপুরে গত ২০১২ সালে লিচু খেয়ে ১৩ শিশু ও ২০১৫ সালে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল বলে প্রতিবেদন দেয় বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা কেন্দ্র।