৫০০ টাকা না দেওয়ার জেরেই শিশু রশীদকে হত্যা করে 'ডন' মোজাফফর!

প্রধান আসামি মোজাফফররংপুর নগরীর টেক্সটাইল মোড়ে ‍শিশু আব্দুর রশীদকে কোপানোর পর চলন্ত গাড়ির নিচে ফেলে 'ডন' মোজাফফর ও তার বাহিনী হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শুক্রবার (৩০ আগস্ট) সাংবাদিকদের এ কথা জানান কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রশীদ। এদিকে নিহত স্কুলছাত্রের পরিবার দাবি করেছে, সম্প্রতি মোজাফফর রশীদের বড় ভাই মোহনের কাছে ৫০০ টাকা চাঁদা দাবি করলে তা দিতে না চাওয়ার জেরে বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) রাত ৯টার দিকে রশীদকে হত্যা করা হয়।

ওসি আব্দুর রশীদ বলেন, ‘শিশু রশীদ হত্যায় তার বাবা শহিদার রহমান বাদী হয়ে মোজাফ্ফরকে প্রধানসহ পাঁচ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নম্বর—৫৯, তারিখ ৩০/০৮/১৯ইং। আসামিদের সবাই আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। আশা করি, সবাইকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসী মোজাফফর ও তার ক্যাডার বাহিনী শিশু রশীদকে কুপিয়ে চলন্ত গাড়ির নিচে ফেলে দিয়েছে। এটা নিষ্ঠুর ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। অপরাধীরা কোনও অবস্থাতেই ছাড় পাবে না।’

এলাকাবাসী ও পুলিশ জানায়, আসামি মোজাফফর এলাকায় ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলেছে। তারা এলাকায় চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত। সে এলাকায় ডন হিসেবে পরিচিত। মোজাফফরের বিরুদ্ধে থানায় ৮-১০টি মামলা থাকলেও সে প্রকাশ্যই ঘুরে বেড়ায়। কেউই তার ভয়ে কথা বলতে সাহস পায় না।

শিশু আব্দুর রশীদনিহত রশীদের বাবা শহিদার রহমান বলেন, ‘কয়েকদিন আগে সন্ত্রাসী মোজাফফর আমার বড় ছেলে অটোচালক মোহনের কাছে পাঁচশ টাকা দাবি করে। টাকা না দেওয়ায় তাকে মারধর করে মোজফফর। এ ঘটনায় মোজাফফরের বাবার কাছে বিচার দেওয়ায় সে ক্ষিপ্ত হয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। আমরা বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য মোজাফফরের বাবা কামালসহ স্বজনদের কাছে অনুরোধ করি। তারা রাজি হলেও মোজাফফর কোনও অবস্থাতেই রাজি হয়নি। আমার সামনেই মোজাফফর ও তার বাহিনী লাঠি ও ছোরা দিয়ে ছেলে রশীদকে কোপাতে থাকে। আমার বোন নাজমা ও আমি অনেক চেষ্টা করেও ছেলেকে রক্ষা করতে পারিনি। সন্ত্রাসীরা আমাদের সামনে চলন্ত গাড়ির নিচে ফেলে নৃশংসভাবে ছেলেকে হত্যা করলো। আমি খুনিদের ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি।’

কে এই মোজাফফর

জানা যায়, রংপুর নগরীর খলিফাটারী এলাকার কামাল মিয়ার ছেলে মোজাফফর। তার বাবা টেক্সটাইল মোড়ে ভাঙাড়ি মালামাল কেনাবেচা করেন। সেখানে তার একটি দোকান আছে। তারা সাতগাড়া মিস্ত্রিপাড়া মহল্লায় বাসা ভাড়া নিয়ে বাস করে। মোজাফফর এলাকায় একটি ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলে। সে নিজেকে ওই এলাকার গড ফাদার দাবি করে। টেক্সটাইল মোড়সহ আশপাশের এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য করলে তাকে মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা দিতে হয়। টাকা না দেওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীকে দোকানপাট গুটিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে, অথবা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। সে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল সড়কে এবং টেক্সটাইল মোড়ে রাতে ক্যাডার বাহিনী নিয়ে ছিনতাই ডাকাতি করে। বিশেষ করে নাইট কোচের যাত্রীরা ওই সড়ক দিয়ে গেলেই তাদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়।

এলাকার মুদি দোকানি মোসলে উদ্দিন বলেন, ‘মোজাফফরের অত্যাচারে আমি টেক্সটাইল মোড়ের দোকান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি।’

গৃহবধূ হাসনা বেগম জানান, মোজফফরের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করলেই বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়।

একই কথা জানান চাকরিজীবী মমিনুল। তিনি বলেন, ‘নতুন জায়গা কিনে বাড়ি করতে গিয়ে তাকে চাঁদা দিতে হয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, মোজাফফর সহযোগী মন্টি, জয় ও বেলালসহ ২০-২৫ জনের একটি বাহিনী গড়ে তুলেছে। তাদের বিরুদ্ধে এলাকায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।

ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, এলাকায় শোকের মাতম

শুক্রবার (৩০ আগস্ট) বিকালে শিশু রশীদের লাশের ময়নাতদন্ত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সম্পন্ন হয়েছে। পরে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে রশীদের লাশ বাড়িতে নিয়ে গেলে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মা রমিচা বেগম ও বাবা শহিদার রহমানসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এলাকাবাসীও অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি।

সরেজমিনে সাতগাড়া মিস্ত্রিপাড়ায় নিহত রশীদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো মহল্লায় শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে। শোকে রশীদের মা বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। তিনি মোজাফফরসহ সবার ফাঁসি দাবি করেন।



আরও পড়ুন...


স্কুলছাত্রকে কোপানোর পর চলন্ত গাড়ির নিচে ফেলে হত্যা!