সম্প্রতি দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী হাকিমপুর থানার ওসিসহ ১২ পুলিশ কর্মকর্তাকে এক সঙ্গে বদলি করা হয়েছে। জনবল স্বল্পতার কারণে হাকিমপুর থানা পুলিশের কার্যক্রম পরিচালনা ব্যহত হচ্ছে। ফলে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিন এলাকায় দেখা না গেলেও, এখন তাদের দেখা যাচ্ছে। পুলিশের নানা অভিযানের কারণে হিলিতে মাদক ব্যবসা অনেক কমলেও এখন তা আবার বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে হাকিমপুর থানার ওসি (তদন্ত) রেজাউল করিম বলেন, ‘এক সঙ্গে ১২ কর্মকর্তার বদলিতে সাময়িক সমস্যা হলেও আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই সব পূরণ হয়ে যাবে।’
গত মঙ্গলবার ২৯ অক্টোবর দিনাজপুরের পুলিশ সুপার সৈয়দ আবু সায়েমকে ঢাকায় সিআইডিতে, সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকারকে ঢাকার ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পুলিশে বদলি করা হয়। একই সঙ্গে আসে ভারত সীমান্ত ঘেষা হাকিমপুর (হিলি) থানার ওসি আনোয়ার হোসেনের বদলির আদেশ। তাকেও বদলি করা হয়েছে ঢাকার ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পুলিশে। এ ছাড়া প্রশাসনিক কারণে বৃহস্পতিবার ( ৩১ অক্টোবর) রাতে হাকিমপুর থানার আরও ৩ এসআই ও ৮ এএসআই এর বদলির আদেশ এসেছে।
হাকিমপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে নিকটবর্তী সীমান্ত এলাকা দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) থানা। এ কারণে আগে থেকেই এখানে মাদকের সহজলভ্যতা ছিল। এখানকার বিভিন্ন এলাকায় ও বাসাবাড়িতে মাদক বিক্রি হতো। এখানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতো মাদক সেবন করতে। ওসি আনোয়ার হোসেন হাকিমপুর থানায় যোগদানের পর মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ এবং ‘মাদক ছাড় নইলে হিলি ছাড়’ এই স্লোগানকে কেন্দ্র করে তিনি স্থানীয় নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষকে নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতেন। এছাড়াও তিনি কমিউনিটি বেস স্কুল কমিটি গঠন করে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক র্যালি ও সভা সমাবেশ করতেন।
গত ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সাল পর্যন্ত হাকিমপুর থানা পুলিশ মাদকবিরোধী বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে। এর মধ্যে ৩৯৭টি মাদক মামলা করা হয়, মামলার আসামি সংখ্যা ৫৮৩ জন এবং ৪৯৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া ১২ হাজার ২১৯ বোতল ফেনসিডিল, ২২ হাজার ১৬৭ পিস ইয়াবা, ১৩ কেজি ৭৬৮ গ্রাম গাঁজা, ৯৩.৬১ গ্রাম হেরোইন, ৪৭ কার্টুন ও ১৪ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে। নেশাজাতীয় ইনজেকশন ২ হাজার ৪৮৩ পিস, চোলাই মদ ৪১০ লিটারসহ পরিত্যাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ৮শ পিস ইয়াবা ও ২৫ বোতল ফেনসিডিল করা হয় উদ্ধার করা হয়।
স্টুডেন্ট বেস কমিউনিটি পুলিশং ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মুহিত আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দেখছিলাম মাদকের কারণে যুবসমাজ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। আমাদের অনেক বন্ধু ও সহপাঠী মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছিল। তাদের সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে আমরা স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা থানা পুলিশের সহযোগীতায় স্টুডেন্ট বেস কমিউনিটি পুলিশিং ইউনিট গঠন করি। আমরা হিলি সীমান্তের বিভিন্ন পাড়া, মহল্লায় গিয়ে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের মাদকের কুফল সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওসিসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বদলিতে এ কার্যক্রম অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়বে।’
হাকিমপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহরাব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হিলি সীমান্ত এলাকা হওয়ার কারণে এখানে মাদকের তৎপরতা অনেক বেশি। এ কারণে আশেপাশের জেলাগুলো এমন কি ঢাকা থেকেও মাদকসেবীরা হিলিতে আসতো মাদকসেবন করতে। আমরা মনে করি মাদক বন্ধে কাজ করা পুলিশের এই টিমকে অন্য জায়গায় বদলি করায়, হিলি আগের চেহেরায় ফিরে আসবে। অনেক মাদক ব্যবসায়ীকে এরইমধ্যে এলাকায় আনাগোনা করতে দেখা যাচ্ছে।’
হাকিমপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুন উর রশীদ হারুন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওসি আনোয়ার হোসেন হাকিমপুর থানায় আসার পর থেকে হাকিমপুরকে মাদকমুক্ত করতে নানামুখি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
হাকিমপুর থানার ওসি (তদন্ত) রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, হঠাৎ করে প্রশাসনিক কারণে গত ২৯ ও ৩১ অক্টোবর দু’দফায় হাকিমপুর থানার ওসিসহ ১২ অফিসারের বদলি হওয়ায় থানায় সাময়িকভাবে জনবল সল্পতা দেখা দিলেও আগামী দু’এক দিনের মধ্যে সব পূরণ হয়ে যাবে।