দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার মুকুন্দপুর ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর গ্রাম। গ্রামের কম বেশি প্রায় সব বাড়িতেই চলছে কুমড়ো ও ডালের বড়ি তৈরির ধুম। বাড়ির আঙিনা, আশেপাশে মাচা করে সেখানে শুকানো হচ্ছে সেগুলো বড়ি। স্বাদে ও মান ভালো হওয়ায় দিন দিন বেড়েই চলেছে বড়ির চাহিদা। বাড়তি আয়ের পথ তৈরি হওয়ায় অন্যান্য কাজের পাশাপাশি বড়ি তৈরি করছেন নারীরা।
সরেজমিন গ্রামে দেখা গেছে, বিশ্বনাথপুর গ্রামের প্রায় প্রতি বাড়িতে বাড়িতে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পরিবারের সদস্যরা কেউ মেশিনে মাষকালাই ডাল ভাঙছেন, কেউ কালাই সানছেন, আবার কেউবা মাচায় বড়ি সাজাচ্ছেন। কেউ কেউ রৌদে বড়ি শুকাচ্ছেন।
ওই গ্রামের কাওসার আলী জানান, প্রথমে যাঁতায় মাষকালাইগুলো ভাঙানো হয়। এরপরে সেগুলো কুলো দিয়ে ঝাড়ার পর তিন ঘণ্টা মতো ভিজিয়ে রাখতে হয়। ভেজা ডালের ওপর থাকা কালো আবরণগুলো আলাদা করার পর আবারও সারারাত ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর সকালে ডাল মেশিনে দিয়ে খামির মতো করা হয়। এরপর সেই খামিরে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে পরিমাণ মতো বড়ি তৈরি করে সেগুলো শুকাতে দেওয়া হয়। প্রতি এক কেজি কালাইয়ে ৭০০ গ্রাম বড়ি তৈরি হয়। প্রতি কেজি বড়ি প্রকারভেদে ২০০-৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়।
দুলাল চন্দ্র রায় জানান, বংশ পরম্পরায় তারা এই বড়ি তৈরি করে আসছেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ কেজি বড়ি তৈরী করেন তারা। আসলে এই বড়িকে কুমড়োর বড়ি বললেও এটি মূলতো মাষকালাইয়ের বড়ি। দামের তারতম্য অনুযায়ী মটরকালাইও ব্যবহার করা হয়। যে বড়িতে শুধু মাষকালাই এবং চালকুমড়া ব্যবহার করা হয় সেই বড়ি প্রতি কেজি ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। আর যে বড়িতে মটরকালাই ব্যবহার করা হয় সেই বড়ি ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়। বিরামপুর ছাড়াও ফুলবাড়ি, দিনাজপুর, হিলি, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ক্রেতারা তাদের গ্রামে বাড়ি কিনতে আসেন।
কৃষ্ণ বালা ও কাওসার আলী জানান, বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে মূলত বড়ি তৈরির কাজ শুরু হয়। কুমড়ো বড়ি তৈরির কাজ চলে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। স্বামী, স্ত্রী ও ছেলে এই তিনজন মিলে প্রতিদিন গড়ে দশ কেজি পরিমাণ কুমরো বড়ি তৈরি করতে পারেন তারা। বছরের এসময় কুমরো বড়ি তৈরি করে পরিবারে ভালোই বাড়তি আয় হয়। তা দিয়ে ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা করাসহ সংসারের অন্যান্য কাজে লাগানো যায় এতে করে সংসারে বেশ উন্নতি হয়েছে।
বচ্চন রায় জানান, অক্টোবরে সাধারণত কৃষকদের হাতে তেমন টাকা থাকে না। তাই ওই সময়ে বাড়ির গরু-ছাগল বিক্রি করে বড়ি তৈরির উপকরণ বিশেষ করে মাষকালাই কিনতে হয়। সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা পেলে এ পেশায় নিয়জিতরা অনেক উপকৃত হতো বলেও জানান তিনি।
অধির রায় জানান, স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। আগে শুধুই কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। এতে করে তার সংসার তেমন ঠিকভাবে চলতো না, প্রায়ই অভাব অনটন লেগেই থাকতো। বাড়তি আয়ের আশায় গত ১০ বছর আগে থেকে তিনি বড়ি তৈরির কাজ শুরু করেন। এতে করে তার পরিবারে ভালোই আয় আসতে শুরু করে। প্রতি কেজি বড়ি বিক্রি করে তাদের ৩০-৪০ টাকা আয় হয়।
পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে বড়ি কিনতে আসা বিপ্লব রায় জানান, দীর্ঘদিন থেকে তারা বিশ্বনাথপুর গ্রাম থেকে পাইকারি বড়ি কিনে নিয়ে যান। বিশ্বনাথপুর গ্রামের বড়ির স্বাদ ভালো হওয়ায় এই বড়ির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
বিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিকছন চন্দ্র পাল জানান, উপজেলার বিশ্বনাথপুর গ্রামের বড়ি স্বাদে ও গুণে ভালো হওয়ায় এখানকার বড়ির চাহিদা ও কদর বেড়েই চলেছে। ওই গ্রামের অনেকেই অন্যান্য পেশার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় কুমরো বড়ি তৈরির কাজ করছেন। এতে করে বছরের অর্ধেক সময় বড়ি তৈরিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক কর্মসংস্থান হচ্ছে। বিশ্বনাথপুর গ্রামের বড়িকে জনপ্রিয় করতে কৃষি বিভাগ উদ্যোগ নিয়েছে।