কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার (তহশিলদার) ইন্ধনে প্রকাশ্যে উপজেলার এক সাংবাদিক পরিবারের ভোগদখল করা রেকর্ডভুক্ত জমির সরিষা তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। শনিবার (৩০ জানুয়ারি) সকালে রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের যাদুরচরপূর্বপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এর আগে বৃহস্পতিবার সাংবাদিক আনিছুর রহমানের চাচা আবুল কালাম বাদী হয়ে রৌমারী উপজেলার সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সাহাদৎ হোসেনসহ ৮ জনের নাম দিয়ে রৌমারী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
রৌমারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমাছ হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সাংবাদিক আনিছের চাচার লিখিত অভিযোগ পেয়ে শুক্রবার (২৯ জানুয়ারি) রাতে ওই ফসলি জমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে মীমাংসার লক্ষ্যে দুই পক্ষকেই কাগজপত্র নিয়ে রবিবার সকাল ১০টায় থানায় হাজির হতে বলা হয়েছিল।কিন্তু বিবাদীরা তা না মেনে শনিবার সকালে ক্ষেতের সব সরিষা গাছ তুলে নিয়ে গেছে।
সাংবাদিক আনিস জানান, তার চাচা আবুল কালাম পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ১৫ শতক জমি দীর্ঘ ৫৩ বছর (১৭.০৪.১৯৬৮ইং) ধর খাজনা দিয়ে ভোগদখল করে আসছেন। যার আরএস খতিয়ান নং ২২৪৯, হোল্ডিং ২২৪৯,দাগ নং ২২১৯। কিন্তু ২০১৭ সালে তহশীলদার শাহাদৎ অবৈধভাবে ওই জমি যাদুরচর পূর্বপাড়া এলাকার মৃত কেরামত আলীর ছেলে আবুল ফজলের নামে নাম জারি করে দেন। এর বিরুদ্ধে আমার চাচা মিস কেস দায়ের করলে ২০২০ সালের মার্চ মাসে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি ) ওই জমির অবৈধ নামজারি বাতিল করে আমার চাচার নামে নামজারি বহাল রাখেন। চাচা নিয়মিত খাজনা দেন ও ওই জমিতে ফসল চাষ করে আসছেন। কিন্তু তহশীলদার শাহাদৎ আবারও এই ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দায়িত্বে আসলে আবুল ফজলের সঙ্গে যোগসাজস করে ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর অবৈধভাবে আবারও ওই জমি আবুল ফজলের নামে নাম জারি করে দেন। তহশীলদার শাহাদতের এসব অনিয়ম নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ করলে শাহাদৎ ক্ষিপ্ত হয়ে আবুল ফজল গংকে ওই জমির ফসল কেটে নিয়ে যে কোনও উপায়ে ওই জমি দখলের পরামর্শ দেন। বিশ্বস্ত মাধ্যমে এই খবর পেয়ে আমার চাচা গত বৃহস্পতিবার রৌমারী থানায় তহশিলদার শাহাদৎ ও আবুল ফজল ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে রৌমারী থানার উপপরিদর্শক(এসআই) আলমাছ হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উভয় পক্ষকে নিজ নিজ কাগজপত্র নিয়ে আগামী রবিবার থানায় আসতে বলেন এবং মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত জমির ফসলে হাত দিতে নিষেধ করেন। এরপরও শনিবার সকালে সন্ত্রাসী কায়দায় দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক আবুল ফজল ও তার বাহিনী ওই জমির সব সরিষা তুলে নিয়ে যায়।
জমির প্রকৃত মালিক দাবিদার আবুল কালাম বলেন, আমি সর্বশেষ গত ২৫ নভেম্বর ২০২০ ওই জমির খাজনা দিয়েছি ( ১৪২৭ বঙ্গাব্দ সাল আদায়) । আমার এ রেকর্ডভুক্ত ও ভোগদখলীয় জমিটি বৈধ কাগজ থাকার পরও তহশিলদার সাহাদৎ হোসেন অবৈধভাবে আবুল ফজল গংদেরকে নামে নাম জারি করে দিয়ে তাদের দখলে নিতে বিভিন্ন ভাবে উস্কানি ও মদত দিয়ে যাচ্ছেন । আমি এর আইনগত সমাধান চাই এবং অভিযুক্তদের শাস্তি চাই।
তহশিলদার শাহাদতের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ওই এলাকাবাসী। আব্দুল ওয়াহেদ (৬৫) নামে ওই এলাকার এক বাসিন্দা জানান, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সাহাদৎ হোসেন সরেজমিন মাঠ পরিদর্শন বা মাঠ জরিপ না করে অফিসে বসে মনগড়া তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি ও প্রস্তাব দিয়ে অবৈধ পন্থায় নামজারি করে দেন। একই কারণে সাংবাদিক আনিছের পরিবারের জমি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে অভিযুক্ত আবুল ফজলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওই জমিটি সাংবাদিক আনিছের বাবা ইসরাফিল খয়রাত নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছিলেন। পরে আমি খয়রাতে কাছে জমিটি আমার স্ত্রীর নামে কিনে নেই। জমির সকল বৈধ কাগজ আমাদের রয়েছে।
জমির সরিষা তোলার সত্যতা স্বীকার করে আবুল ফজল বলেন, ‘ জমির সরিষা আমরা আবাদ করেছি। সেজন্য আমরাই তুলে নিয়েছি।’
তবে অভিযুক্ত তহশীলদারের কণ্ঠে আবুল ফজলের প্রতি সমর্থনের সুর শোনা গেছে। নিজেকে আবুল ফজলের প্রতিবেশী পরিচয় দিয়ে অভিযুক্ত তহশিলদার সাহাদৎ হোসেন বলেন, ‘তারা (আবুল ফজল গং) যা করছেন তা আইন মেনে করছেন। জমি তাদের দখলে থাকায় সরিষা তুলে নিয়ে গেছে।’ নাম জারির ক্ষেত্রে কোনও অনিয়ম হয়নি এবং তিনি জমির ফসল তুলে নিতে কোনও উস্কানি দেননি বলেও দাবি করেন এই ভূমি সহকারী কর্মকর্তা।
নামজারিতে অনিয়ম না হলে পূর্বের মিসকেসে কেন বাতিল করা হলো, এমন প্রশ্নে তহশিলদার শাহাদৎ তৎকালীন ভূমি সহকারী কমিশনারকে দায়ী করে বলেন, ‘সেটা ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনারের ( এসি ল্যান্ড) এখতিয়ার। তিনি কীভাবে দিয়েছেন তা তিনি জানেন।’
রৌমারী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) গোলাম ফেরদৌস জানান, ওই জমির সর্বশেষ নামজারি নিয়ে আবারও একটি মিসকেস ফাইল হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করা হবে।
রৌমারী নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, ‘ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তারা সাহাদতের বিরুদ্ধে সরেজমিন পরিদর্শন ও মাঠ জরিপ না করেই অফিসে বসে মনগড়া তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’