মাটির বাড়ির ধানজুড়ি গ্রাম

বিরামপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি সাঁওতাল অধ্যুষিত একটি গ্রাম ধানজুড়ি। এখানে রয়েছে ১১৫টি বসতঘর, অধিকাংশই মাটির বাড়ি। প্রতিটি বাড়ি বিভিন্ন ধরনের আলপনা দিয়ে করা রয়েছে সুসজ্জিত। সেই সঙ্গে পুরো গ্রামটিই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম ও সুন্দর করে সাজানো। ছবির মতো সাজানো গ্রামটি দেখতে প্রতিদনিই ভিড় জমান দেশ ও বিদেশের পর্যটকরা।

ধানজুড়ি গ্রামের সাঁওতাল নেতা কেরোবিন হেমব্রম ও রুপলাল তির্কি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের গ্রামের নাম ধানজুড়ি। এই গ্রামের সব বাড়িই মাটি দিয়ে তৈরি। আমাদের জনগোষ্ঠির ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে আমরা সেই পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই এখানে মাটির বাড়ি নির্মাণ করে আসছি। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা এখনও মাটির বাড়িতেই থাকছি। অন্যান্য এলাকায় মাটির বাড়ি তেমন দেখা না গেলেও আমাদের এই গ্রামে প্রথম থেকেই মাটির বাড়ি আছে। এছাড়া মাটির ঘরের তালার ওপরে বর্ষাকালে ধান রাখা যায়, এই মাটির বাড়িগুলোতে তেমন আদ্রতাও থাকে না, আর মাটির বাড়ি তৈরিতে খরচও কম হয়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের মা-বোনেরা ছোটকাল থেকেই মাটির বাড়ির কাজ শিখে, প্রতিটি মাটির বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের আলপনা তৈরি করে আরও সুন্দর করে তোলেন। দেয়াল থেকে শুরু করে, জানালা, দরজা, তালাতে সবজায়গায় সুন্দর আলপনা আঁকেন তারা। বছরে দুই বার মাটির বাড়িগুলো রঙ ও আল্পনায় সেজে ওঠে। এছাড়া বিভিন্ন উৎসবের আগেও বাড়িগুলোকে সাজিয়ে তোলা হয়। এছাড়া আমাদের গ্রামের মানুষজন বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে। গ্রামটির সঙ্গে লাগা রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ধানজুড়ি মিশন ও কুষ্ঠ হাসপাতাল, এ কারণে এ অঞ্চলে অনেক রোগীই আসেন সেবা নিতে। আমাদের এই মাটির বাড়িগুলো দেখতে দেশের অনেক স্থানের মানুষজনসহ অনেক বিদেশিরাও ভিড় জমান।

স্থানীয় বাসন্তি রানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বর্তমান সময়ে আমরা ইটের বাড়ি না করে আদিকালের সেই মাটির বাড়ি তৈরি করেছি। এর কারনণ মাটির বাড়িগুলো সহজেই লেপ দিয় সুন্দর করে তোলা যায়, যেভাবেই আমরা সাজাতে চাই সেভাবেই আমরা সাজাতে পারি। সেজন্য আমরা ঐতিহ্য হিসেবে মাটির বাড়ি এখনও ধরে রেখেছি।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির অপর এক নারী বিতিয়া মুর্মু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদেরতো সেই আদিকাল থেকেই মাটির বাড়ি। আমরা নিজেদের বাড়ি-ঘর সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে ভালোবাসি। এছাড়া ইটের বাড়ি থেকে মাটির বাড়িগুলো আমাদের বেশি পছন্দ। ইটের বাড়িগুলোর তুলনায় মাটির বাড়িগুলো তেমন গরম হয় না, গরমেও অনেকটা ইয়ারকন্ডিশনের মতো ভাব থাকে। এ কারণে ইটের বাড়ির চেয়ে মাটির বাড়িতে বেশি আরাম।

মাটিরবাড়ি অধ্যুষিত ধানজুড়ি গ্রাম দেখতে আসা শরিফুল ইসলাম ও ইয়াসমিন সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অন্যান্য গ্রামের চাইতে এই গ্রামের মানুষেরা একটু আলাদা। এখানকার বাসিন্দারা অত্যন্ত পরিপাটি করে গ্রামটিকে সাজিয়েছে। সড়কের দুই পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে তারা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সাধারণত মাটির বাড়ি এখন আর দেখা যায় না। তবে এখানকার প্রতিটি বাড়ি শুধু মাটি দিয়ে তৈরি না শুধু, বিভিন্ন প্রকার আলপনা দিয়ে মাটির বাড়িগুলোকে সাজানো হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিটি বাড়ি-ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাসহ স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাও রেখেছেন তারা। যা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।

বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পরিমল কুমার সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাঁওতালদের ধানজুড়ি গ্রামটি একটি সম্ভাবনাময় স্থান। গ্রামটিকে যদি একটু সুন্দর করে রাখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ফুল ও ফলের গাছ লাগিয়ে সাজিয়ে তোলা যায় তাহলে এটি পর্যটন স্থান হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় আশুড়ার বিলের উপরে একটি ঝুলন্ত ব্রিজ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সব ঠিক থাকলে ধানজুড়ি গ্রাম ও ঝলুন্ত ব্রিজের সমন্বয়ে একটি পর্যটন স্থান গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।