লিচুর জেলা হিসেবে দিনাজপুরের খ্যাতি রয়েছে বাংলাদেশ জুড়ে। এরইমধ্যে জেলার লিচুর বাগানগুলোতে ফুল থেকে ফল ধরতে শুরু করেছে। তবে এ বছর লিচুর মুকুল তুলনামূলক কম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও করোনার কারণে বাজার নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। ফলে এখন থেকেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে লিচু চাষি-বাগানীদের মাথায়।
লিচুর ফলনে বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে কৃষিবিদরা বলছেন, শীতকালে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম ছিল। এ কারণে গাছে ফুল না ধরে কচি পাতা বের হয়েছে। একইসঙ্গে লিচু গাছে মাত্রাতিরিক্ত হরমোন ও রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে গাছের উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
আবাদ কত
দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টার সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর জেলায় সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে। সেখানে গাছ রয়েছে সাত লাখের ওপরে। যা থেকে গত বছরে ৩৫ হাজার মেট্রিক টনের ওপরে লিচুর ফলন হয়েছিল। চলতি বছর লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে ৪০ হাজার মেট্রিক টন।
প্রতি বছর এই জেলায় সোয়া চারশ’ থেকে সাড়ে চারশ’ কোটি টাকার বেশি লিচু বেচাকেনা হয়। দিনাজপুর জেলায় যেসব লিচু আবাদ হয় তার মধ্যে বোম্বাই, মাদ্রাজি, চায়না থ্রি, চায়না টু, কাঠালি, বেদানাসহ বিভিন্ন জাতের লিচুর আবাদ হয়। তার মধ্যে বেশি আবাদ হয় বোম্বাই ও মাদ্রাজি জাতের লিচু। চলতি বছরে এই দুই জাতের লিচুতে মুকুল কম এসেছে।
চাষিরা কী বলছেন
দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর এলাকার বাগানী রেজাউল করিম মানিক বলেন, ‘আমার বাগানে গত বছর ১০ লাখ লিচু পেয়েছিলাম। এ বছর ছয় লাখও পাবো কিনা সন্দেহ আছে। আমার মনে হয় এ বছর ফলন কম হওয়ার কারণ মূলত আবাহাওয়া। এ বছর শেষের দিকে প্রচুর কুয়াশা হয়েছে। যার কারণে যে সময় মুকুল ফুটে বের হওয়ার কথা, তখন বের হয়েছে নতুন পাতা।’
তিনি বলেন, ‘এখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো বাকি আছে। সামনে বৈশাখ মাসে যেমন ঝড় আছে। কী হবে জানি না। যদি ঝড়ে বাগানে ক্ষতি হয় তবে আমাদের মতো বাগানী যারা আছে তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বছর লাভবান হওয়ার সুযোগ খুবই কম। কারণ আমরা যে খরচ করি, যেমন পাহারাদার, লোকজন রাখা, গাছ থেকে লিচু নামানোর খরচ, তার সবটা মিলেয়ে লস না হলেও আশা করছি গায়ে গায়ে যাবে। জানি না এ বছরের বাজার কেমন হবে। ভালো হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে।’
দিনাজপুর সদর উপজেলার পশ্চিম শিবরামপুর এলাকার জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাগানে ১৮০টি গাছ আছে। গত বছর ৪০টি গাছে ফল আসেনি। আর এ বছর ৭০টি গাছে ফল আসেনি। গত বার লিচু খুব ভালো হয়েছিল। এ বছর কুয়াশা বেশি, তাই ফলন কম। গত বছর ফলন দেখে আমি বাগান কিনছি। এ বছরের ফলনের জন্য ভালোমত পরিচর্যা করেছি। আমি বাগানে ফলের জন্য খুবই চেষ্টা করেছি। কিন্তু এ বছর ফলন নাই। যা ফল দেখছি এতে করে ভাগ্যে যা আছে, যা হয় হবে।’
একই এলাকার বাগানী আব্দুর রফিক বলেন, ‘গত বছর করোনার মধ্যেও ফলন ভালো ছিল। এ বছর আকাশে পানি নাই, বৃষ্টি নাই, রোদ বেশি, ওয়েদার খারাপ। তা ছাড়া এ বছর মুকুল কমই আসছে। যা মুকুল এসেছিল তা রোদের কারণে পুড়ে গেছে। এবার বাগানীদের পুরোপুরি লস।’
বিরলের ধুকুরঝাড়ী এলাকার লিচু চাষি রশিদুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরেই একটু লোকসানের মধ্যে আছি। দুই বছরে লিচুর মৌসুমে রোজার মাস পড়েছিল, আর গত বছর ছিল করোনা। এবারে করোনা তো আছেই। আবার মুকুলও কম এসেছে। তাই লাভের আশা এবার ছেড়ে দিয়েছি। পরিচর্যা যতটুকু না করলেই নয় ততটুকু করছি। কারণ অব্যাহত লোকসানে আর আশা ভর করছে না।’
একই এলাকার কৃষক সোলায়মান আলী বলেন, ‘লিচু এবারে কম আসলো কেন সেটা ঠিক বুঝছি না। তবে এই কম আসায় আমাদের লোকসান। অন্যান্য বছরগুলোতে মুকুল আসার পরপরই বাগানীরা বাগান কিনে নেয়। এবারে আমার বাগান কেনার জন্য এখনও কেউ আসেনি।’
কৃষিবিদরা যা বলছেন
দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ প্রদীপ কুমার গুহ বলেন, ‘এ বছর আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে লিচু ফলনে কিছুটা বিপর্যয় হয়েছে। লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ফলন হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে দিনাজপুরের লিচু বাগানগুলোতে পুষ্পমঞ্জুরী থেকে ফল আসতে শুরু করেছে। দিনাজপুরে যেসব জাতের লিচুর চাষ হয়, তার মধ্যে বোম্বাই জাতের লিচুই আছে ৫০ শতাংশের বেশি। এই জাতটিতে তুলনামূলক পুষ্পমঞ্জুরী কম। আসেনি এবার আশানুরূপ ফল।’
তিনি বলেন, ‘ফলন না আসার কারণগুলোর মধ্যে সাধারণত আমরা যেগুলো উল্লেখ করতে পারি তা হলো আবহাওয়া। আবার তার পাশাপাশি গাছের পরিচর্যার বিষয়টিও আছে। গাছের ফলন অনেকটা নির্ভর করে আবহাওয়ার ওপর। গত মৌসুমে শীতের মাত্রাটি ছিল ভিন্ন। মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা পড়েছে, আবার মাঝে মাঝে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এসেছে। ধারাবাহিকভাবে শীত না থাকায় কার্বন ও নাইট্রোজেন রেশিও কমবেশি হয়েছে। এই রেশিওতে যদি নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেশি হয়ে যায়। অর্থাৎ তাপমাত্রা যদি বেশি হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে গাছ বেশি পরিমাণ খাদ্যগ্রহণ করে থাকে। এতে করে গাছে পুষ্পমঞ্জুরী না এসে গজাবে কচি পাতা।’
এই কৃষিবিদ আরও বলেন, ‘আবার অন্যদিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এ জেলায় প্রায় অনেক বাগানই চুক্তিতে বিক্রি হয়। যারা বাগান নেন, লিচুর মুকুল আসার সময়টাতেই তারা শুধু পরিচর্যা করেন। আবার ফলন শেষে চলে যান। বছরব্যাপী পরিচর্যার অভাবের কারণে লিচু কমে যাচ্ছে। আর বাগানীরা মৌসুমের শুরুতে নানাপ্রকার হরমোন, রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেন যার প্রভাবে গাছের যে উৎপাদন ক্ষমতা তা ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। এ সব বিষয়ে আমরা কৃষদের সচেতন করছি।’