অসহায় মেয়ের কাঁধে মায়ের ভার

ছয় বছর ধরে অসুস্থতাজনিত কারণে শারীরিক সক্ষমতা হারিয়েছেন আকলিমা বেগম (৫৮)। হাত-পা সহ শরীরের প্রতিটি অঙ্গ থাকার পরেও চলার কোনও শক্তি নেই তার। চলাফেরা দূরের কথা, নিজের পরনের পোশাকও সামলে নিতে পারেন না। ঘর থেকে বাড়ির আঙিনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া আকলিমার জীবনে চলার একমাত্র অবলম্বন বিয়ে হয়ে অন্য সংসারে চলে যাওয়া মেয়ে দুলালী। ওই মেয়ের কাঁধে ভর করে স্থানান্তরিত হতে হয় তাকে। স্বামী দেলোয়ার হোসেন শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন। দারিদ্র্যের জাতাকলে সঙ্গিন হয়ে পড়েছে আকলিমা-দেলোয়ারের জীবন।

আকলিমার বাড়ি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের হলোখানা গ্রামে। ছয় বছর আগে হঠাৎ প্যারালাইজড হয়ে শারীরিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। সাধ্য অনুযায়ী কিছুদিন চিকিৎসা করা হলেও সুস্থ হননি। তখন থেকেই মেয়ের কাঁধে ভর দিয়ে সীমিত চলাফেরা আকলিমার।

ধরলা অববাহিকার কাছে হলোখানা গ্রামে আকলিমার বাড়ির কাছ দিয়ে গেলে দেখা যাবে আঙিনায় একটি টঙে (মাচান) শুয়ে গলা ছেড়ে দিয়ে কাতরাচ্ছেন আকলিমা। ‘ও মা,’ ‘ও বাবা’ বলে চিৎকার করে নিজের রোগ-যন্ত্রণা আর আকুতি চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। কিন্তু গ্রামের সবার দীর্ঘদিনের পরিচিত এই আকুতি অনেকের হৃদয় প্রকম্পিত করলেও তার কাছে কেউ খুব একটা আসেন না। তাই বাতাসে প্রতিধ্বনি হতে থাকে আকলিমার আকুতি। বিকলাঙ্গ স্বামী দেলোয়ারের কোনও উপার্জন না থাকায় চিকিৎসাও সম্ভব হয় না, এমনটাই জানান আকলিমার মেয়ে দুলালী।

দুলালী বলেন, ‘ ১০-১২ বছর ধরে আমার বাবা পঙ্গু। লাঠি ভর দিয়ে চলাফেরা করেন। আর ছয় বছর আগে হঠাৎ করে মা অসুস্থ হয়ে চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারিনি। দুই ভাইয়ের একজন কাজ করার জন্য ভারতে থাকে। আর অন্য ভাই শ্রবণ প্রতিবন্ধী। বাবা-মার খাবারেরও অনেক কষ্ট। আমি স্বামীর সংসারে থেকে অন্যের বাড়িতে কাজ করে বাবা-মার জন্য মাঝে মাঝে খাবারের ব্যবস্থা করি। এজন্য স্বামীর গালিগালাজ সহ্য করা লাগে।’

বৃদ্ধ বাবা-মার দুরবস্থার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে আমি না আসলে ঘর থেকে বের হওয়া সম্ভব হয় না মায়ের, তার পায়খানা-প্রসাব করাও হয় না। আমার কাঁধে করেই মাকে বের করে বাইরের টঙে বসায় রাখি। তিনি নিজে শুতে-বসতেও পারেন না। এমনকি নিজের গায়ের কাপড়টাও ঠিক করতে পারেন না। আমার মায়ের জন্যে কিছু করেন, অন্তত তার চিকিৎসা আর একটা হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করলে মায়ের কষ্ট একটু হলেও কমবে। আমিও একটু স্বস্তি পাবো।

‘আমাদের খাবার জোটানোর সাধ্য হয় না, মায়ের চিকিৎসা করাই কী দিয়ে? কেউ একটা হুইল চেয়ার দিলেও মাকে সেটায় করে বহন করতে পারি। মাকে তো ফেলতে পারি না!’

ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়ে আকলিমার স্বামী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি তো নিজেই চলতে পারি না বাবা।’

হলোখানা ইউনিয়ন পরিষদের ৩নং ওয়ার্ড সদস্য মোক্তার হোসেন জানান, শারীরিক অসুস্থতায় নাজেহাল আকলিমার পরিবারকে বিভিন্ন সময় সামান্য খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও তাদের চিকিৎসা আর হুইল চেয়ার দেওয়ার মতো কোনও ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। অসহায় আকলিমার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এই ইউপি সদস্য।

ওই গ্রামের চর হলোখানা এমদাদিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ খন্দকার মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘আকলিমার পরিবারে দারিদ্যের সব বৈশিষ্ট্য জড়ো হয়েছে। ওই পথে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে আমি নিজে সামান্য অর্থ সহায়তা করার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটা আকলিমার রোগ যন্ত্রণা কিংবা অক্ষমতা দূর করার জন্য কোনোভাবেই সহায়ক নয়। আকলিমার চিকিৎসার ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজন একটি হুইল চেয়ার। সরকার কিংবা সমাজের কেউ এ জন্য এগিয়ে এলে আল্লাহ নিশ্চয় উত্তম প্রতিদান দেবেন।’